মোজাম্মেল হক নিয়োগী
অধিকতর খ্যাতির ছায়ায় কম খ্যাতি ঢাকা পড়ে যায়। আমজাদ হোসেনের বেলায় তাই ঘটেছে। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘কসাই’ ও ‘সুন্দরী’ প্রভৃতি নামে কয়েকটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাহিনিকার ও নির্মাতা হিসেবে আমজাদ হোসেনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠার ফলে কথাসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ততটা দীপ্তি ছড়াতে পারেনি। অথচ কথাসাহিত্যেও খ্যাতি উচ্চপর্যায়ে থাকার কথা ছিল। তিনি টিভি নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। লিখেছেন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, কিশোর উপন্যাস ও রাজনৈতিক প্রবন্ধ। তাঁর গল্প ও উপন্যাস অত্যন্ত নিটোল, গোছানো এবং সাবলীল ভাষায় লেখা। আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার বিষয়টি জানা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি কর্মেই দীপ্তিমান। চলচ্চিত্রে তাঁর সাফল্য বলতে গেলে আকাশছোঁয়া। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বেশ কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিখ্যাত ‘দেশ’ সাহিত্য পত্রিকায়। তাঁর রচিত সামাজিক উপন্যাস ১২টি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ৪টি, কিশোর উপন্যাস ৭টি, গল্পগ্রন্থ ২টি, চলচ্চিত্র কাহিনি ও ২০টি, নাটক ২টি, চলচ্চিত্রের গান ১১টি। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর রচিত উপন্যাস (যদিও উপন্যাস বলা হয়ে থাকে) ‘অবেলায় অসময়’ একটি পকেটসাইজ বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭০।
পাক হানাদার বাহিনী যখন নির্বিচারে গণহত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ শুরু করে, তখন এ দেশের এক কোটি মানুষ প্রাণ বাঁচানোর প্রয়াসে ভারতে আশ্রয় নেয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালেই প্রাণের ভয়ে মানুষেরা বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পত্তি, ধন-সম্পদ, জমি-জিরাত, গরু-ছাগল ইত্যাদি ফেলে রেখে ভারতে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং প্রথম দিকের কয়েক মাস দল বেঁধে বিভিন্ন পথে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে। ‘অবেলায় অসময়’ উপন্যাসও ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিশেষ করে শহর থেকে এবং হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা থেকে শরণার্থীদের পালানোর দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। ওই দুর্ভোগ ও দুর্যোগের সময় অস্তিত্বের লড়াইয়ে মানুষের পালানো ছাড়া তখন আর উপায় ছিল না। এই প্রবন্ধগ্রন্থে শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে যাত্রার এ-রকম আরও দুটি আখ্যান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে পাওয়া যায়; একটি শওকত ওসমানের ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ এবং শওকত আলীর ‘যাত্রা’।
ছয়টি অধ্যায়ে গ্রন্থিত এই উপন্যাসের কাহিনি শুরু ও শেষ নদী পথে একটি ‘গয়না নৌকা’র যাত্রীদের নিয়ে। বাংলাদেশের হরিরামপুর নামে কোনো এক গ্রাম পাকিস্তানি মিলিটারি দ্বারা আক্রান্ত হলে সেই গ্রাম থেকে কিছু মানুষ আত্মরক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য আলী মাঝির নৌকায় সওয়ার হয়ে গন্তব্যহীন অজানা সীমান্তের দিকে যাত্রা শুরু করে তারা। নদীপথে নৌকাটি ছয় দিন চলে এবং ছয় দিনের মধ্যে আখ্যানও শেষ হয়। একটি গ্রাম পাকসেনাদের দেওয়া আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে, আর সেই আগুন যেন প্রাণ নিয়ে বাঁচার তাগিদে পালিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তু মানুষগুলোর বুকের ভেতরেও তীব্র যন্ত্রণায় দাউ দাউ করে আগুন জ¦লছে। গ্রামে পুড়ছে তাদের বাড়ি-ঘর, সহায়-সম্পদ আর নৌকার ভেতরে পুড়ছে তাদের হৃদয় ও মননের বিষয়-আশয় এবং যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষগুলো আর্তনাদ হাহাকারের মধ্য দিয়ে অজানার পথে জীবন বাঁচানোর জন্য চলছে। আখ্যানটি যেভাবে শুরু হয়েছে-
আজ ছ’দিন। গোলাবারুদের প্রচন্ড শব্দে উড়ে গেছে এদেশের সমস্ত পাখি। বসতির ধুলাবালি-কাদায় মানুষের চিহ্ন আছে শুধু, কিন্তু মানুষ নেই কোথাও। তারই পাড়ে পাড়ে, দীর্ঘ এক নদীতে, একটাই মাত্র নৌকো সাংঘাতিক সন্তর্পণে, ভয়ে ভয়ে ছুপছুপ করে এগুচ্ছে।
এইটুকু নৌকোর ভিতরে অনেক মানুষ। ঠাসাঠাসি-গিজগিজে। এর ভিতরেই সব হাঁটু ভেঙে, মাথা গুঁজে, ঠেলে-ঠুলে বসে আছে। [অবেলায় অসময়, পৃ. ৭]
লেখক শুরুতেই যুদ্ধকালীন দেশের পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ দৃশ্যকল্প চিত্রিত করেছেন, যা থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় একটি নৌকার ভেতরে মানুষ কতটা ভয়াতঙ্কে জীবন বাজি রেখে নিজেদের বাড়িঘর-বসতি-দেশ ছেড়ে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা শুরু করেছে। আমজাদ হোসেন চিত্রনাট্য লেখার শিল্পটি এই আখ্যানেও কাজে লাগিয়েছেন। তিনি পাতায় পাতায় অঙ্কন করেছেন কষ্ট, দুর্ভোগ, কষ্ট ও মর্মান্তিক জীবনের ছবি। ‘আজ ছ’দিন’ উপন্যাসের প্রথম বাক্য এবং ছ’দিনের নদীপথের মানুষের নৌকার ভেতরের মিথস্ক্রিয়ার ফসলই এই আখ্যান। ষষ্ঠ দিন থেকে উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়ে ফ্ল্যাশব্যাকে প্রথম দিন থেকে যাত্রার ক্রমধারায় বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়।
এ দু’দিনেই মানুষগুলো বদলে গেছে অনেক। অনিদ্রা-অনাহারে সব বিবর্ণ, হলদে হয়ে যাচ্ছে। কোমর টন টন করছে ব্যথায়। উঠে দাঁড়িয়ে একবার হাত-পা ছাড়ানোর মতো শক্তি নেই অনেকের। বিশেষ করে যারা প্রবীণ, বৃদ্ধ। তাদের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এখন অবশ। পঙ্গু রোগীর মতো। [তদেব, পৃ. ৭]
দুটি বর্ণনায় নৌকার যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়া যায়। নৌকা এগিয়ে চলছে আর করুণ ও মর্মান্তিক ঘটনাবলি পুঞ্জীভ‚ত হচ্ছে। লেখক গল্প নির্মাণে অত্যন্ত কৌশলী কারিগর বলেই তিনি নৌকার মধ্যেই সৃষ্টি করেছেন একটি সমাজ, যে সমাজে রয়েছে বিভিন্ন চরিত্র। এসব চরিত্র যেন আমাদের সমাজের প্রতিভ‚। তারা প্রতিনিধিত্ব করছে সারা দেশের বিভিন্ন মানুষের।
নৌকার মাঝির নাম আলী। সে অতিশয় মানবিক এবং সে জীবন বাজি রেখে সমস্ত সত্তা দিয়ে নৌকার মানুষগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্যে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে।
দুটি নাটকীয় চরিত্র, এই উপন্যাসিকাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা, মর্মান্তিক হলেও ফিকশন হিসেবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বটে- নবদম্পতি; যাদের শরীরে এখনো বিয়ের পোশাক রয়েছে। বিয়ের আসর থেকেই জানের ভয়ে তারা পালিয়ে নৌকায় উঠেছে। এ-রকম নৌকাযাত্রার আখ্যানে সাধারণত কোনো প্রোটাগনিস্ট থাকার কথা নয়; কিন্তু লেখক সূ² কৌশলে আখ্যানের নায়ক-নায়িকা হিসেবে এই নবদম্পতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একটি সফল ট্র্যাজিডি আখ্যানে রূপ দিয়েছেন। বর যেন সাক্ষাৎ রাজপুত্তর, সুপুরুষ। তারা বাসরঘর থেকে নৌকায় চড়েছে। গ্রামটিতে যখন হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে গুলিবর্ষণ করেছে, তখন নববধূর বুকে গুলি লাগে। বরও যেন তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। নদীপথে নৌকায় কী আর চেষ্টা! কেবল বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¡না-প্রবোধ ছাড়া; তা-ই করছে সে নৌকার সব যাত্রীর সামনে। তাদের দুজনের ভালোবাসার, মানবতার ভালোবাসার, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার, সর্বোপরি জীবনের প্রতি ভালোবাসার প্রগাঢ় বন্ধনের বার্তা যেন ছড়িয়ে যায় মানবকুলে। বাঁচার জন্য নববধূর করুণ আকুতি লেখক দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন-
ওদের এই করুণ অবস্থাটা সইতে পারছে না আলী মাঝি। কোনো কোনো মুহূর্তে ওদের জন্যই জোরে জোরে বৈঠা চালায় সে। বাসর রাতে মেয়েটির বুকে গুলি লেগেছে। তারপর থেকেই তারা আলী মাঝির নৌকোতে। এই দু’দিন অসম্ভব রক্ত ঝরার পরও মেয়েটি বেঁচে আছে। ছেলেটার বুক ধরে তবু সে বাঁচতে চাচ্ছে। যে করেই হোক অন্তত এই মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। আলী মাঝির বৈঠার ঝাপটায়, নদীর কিছুটা জায়গা হঠাৎ চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায়। নৌকোটা একটু দ্রুত চলে। [তদেব, পৃ. ৯]
মানুষের পেশি আর মস্তিষ্ক কতক্ষণই-বা কাজ করে। পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অবসাদ। আলী মাঝি ছ’দিন একা একা বৈঠা চালাচ্ছে; সেও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আর তখন তার স্মৃতিস্রোতে ভেসে ওঠে সেদিনকার অর্থাৎ ছ’দিন আগে গ্রামে হানাদারদের আক্রমণের দৃশ্যগুলো, মসজিদের পাশে ইমাম সাহেবের মৃতদেহ, বাড়িতে বাড়িতে আগুনের লেলিহান শিখা, বিক্ষিপ্ত-উৎক্ষিপ্ত আগুনের লুক্কা, প্রাণের ভয়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষের ছোটাছুটি, অসংখ্য মানুষের আর্তনাদ, গোলাগুলির শব্দে শ্রবণশক্তি স্তব্ধ প্রভৃতি ঘটনার মর্মান্তিক বর্ণনা।
এই গয়নানৌকোয় আদম ও হাওয়া নামে এক দম্পতির চরিত্র নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের সুঠাম দেহের যুবক আদম ও বাইশ বছরের সুন্দরী হাওয়া- এই দম্পতির পাঁচ মাসের একটি ছেলে ছিল; মানুষের হইহুল্লোড়ে কার বা কাদের পদপিষ্টে ছেলেটি নিখোঁজ বলা যায়নি। ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা, বাকরুদ্ধ স্বামী-স্ত্রীও নৌকার যাত্রী। হাওয়ার বুক খোলা। বুক থেকে ছিঁড়ে ফেলেছে ব্লাউজ, পিনোন্নত স্তন ফুলের মতো প্রস্ফুটিত। দিশেহারা মানুষের যা হয় তারই একটি স্বরূপ উন্মোচন করেছেন লেখক।
এই নৌকায় সব যাত্রী মানুষ, মানবধর্মের। কেউ মুসলমান নয়, কেউ হিন্দু নয়, কেউ বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান নয়। এখানে নেই ধর্মের দোহাই, নেই সাম্প্রদায়িকতা। এখানে সকলেই মানুষ। লেখক সেভাবেই দেখিয়েছেন ঘটনার পরম্পরার বিনুনি বুনে-
হাওয়া খুব শক্ত হয়ে গেলো। ছিটের ব্লাউজটা টেনে তুলে দুধভরা টসটসে স্তন দুটি বের করে ফেললো সবার সামনেই। এ দৃশ্য দেখে মেয়েরা আঁতকে উঠলো। পুরুষরা কেউ কেউ মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আবার কেউ এই অপ্রত্যাশিত অবস্থা দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ়।
ঝট করে ব্রজরানীর কোল থেকে ছেলেটাকে টেনে নিয়ে, হাওয়া তার মুখে পুরে দিলো একটা স্তন। ছেলেটা হাউসফাউস করে খেতে লাগলো সেই দুধ। এই দৃশ্য দেখে সবাই অবাক। এক মুসলমান মহিলার বুকের দুধ খাচ্ছে ব্রজনারীর ছেলে। হাওয়া বিবির প্রতি শ্রদ্ধায় পুরুষদের মাথা অনেকটা নিচু হয়ে গেলো। মেয়েদের চোখ কান্নার জলে টলমল করে উঠলো। [তদেব, পৃ. ২৩]
এরপরের দৃশ্যটি আরও মানবীয়, আরও হৃদয়স্পর্শী, আরও আবেগকাতুরে:
ব্রজরানীর শ্বশুর রামকৃষ্ণ বাবু তাড়াতাড়ি বুক পকেট থেকে পেতলের একটা রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি বের করে ছুড়ে মারলো নদীতে। অক‚ল ঘোলাটে জলের ভিতরে ডুবে গেলো রাধাকৃষ্ণ। রামকৃষ্ণ বাবু জোড় হাতে প্রণামের ভঙ্গিতে হাওয়াকে বললো,
তুমি যা দিলে, তার কাছে ঐ পেতলের মূর্তি হেরে গেলো মা। দেবীর আসন তোমারই হওয়া উচিত। এতোদিন মিলিটারির ভয়ে ঐ যুগল মূর্তিকে আমি বুকের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলাম। তোমার মতো স্বর্ণময়ীর কাছে সত্যি ওটা পেতল, তাই ফেলে দিলাম। [তদেব, পৃ. ২৪]
হাওয়াও মানবতাকে সমুন্নত রেখে জবাব দিয়েছে। মানুষ হয়ে মানুষকে প্রমাণ করার প্রয়োজন বরং দেবদেবী বাদ দিয়ে সবাই মিলে বাঁচার চেষ্টা করি। হাওয়া বিবি হয়ে ওঠে যেন মানবতার দেবী, মনে হলো ‘মা’ হাওয়া তার সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রকৃতির কোলে বসে আছেন দুগ্ধ দান করতে। দৃশ্যটি এমনই অকল্পনীয়। হাওয়া বিবির বক্ষ উন্মুক্ত, নৌকোর আরও কয়েকটি শিশুকে স্তন্য পান করাচ্ছে। এই দৃশ্য দৃষ্টিকটু হলেও পুরুষের মনের সমস্ত সংকীর্ণতা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায় নারীত্ব ও মাতৃত্বের গৌরবের কাছে।
তৃতীয় দিন নৌকোটি একটি নির্জন মরা-মরা স্তব্ধতায় ঢাকা একটি ঘাটে থামে। সেখানে একটি ছোটখাটো কিছু দোকানপাটও ছিল। মানুষগুলো হঠাৎ যেন আধুনিক মানুষ থাকে না; তারা হয়ে ওঠে আদিম মানুষ। খাবারের খোঁজ করতে থাকে। কয়েকটি মুদির দোকানের তালা ভেঙে কিছু খাবার জোগাড় করে; আধা কাঁচা, আধা রান্না খাবার খায় গ্রোগ্রাসে। সাকিনার রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে কাশেম পাগলের মতো ডাক্তার খোঁজে। কোথায় পাবে ডাক্তার? শেষাবধি, সে ছোটবেলার স্মৃতি থেকে গাঁদাফুলের গাছ কুড়িয়ে আনে। তার ধারণা, আর দুটি দিন সাকিনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে আর ভয় নেই। দুই দিন পর তাকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
ওই গ্রামে মসজিদের ইমাম সাহেবের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় যে হত্যাকান্ডে প্রতিফলিত হয় এ দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের সমগ্র চিত্র। প্রতীকী অর্থে একটি গ্রাম শুধু পুড়ছে না, বরং সারাটা দেশ পুড়ছে হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর এ দেশের রাজাকার আলবদর বাহিনীর মানুষের চরম নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতার আগুনে। আলী মাঝির মক্তবের শিক্ষক ইমাম সাহেব। আলী মাঝিও আবেগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তার স্ত্রী ফাতেমার কথা মনে পড়ে। নৌকাটির দিকে তাকালেই ফাতেমার কথা মনে পড়ে; কেননা, একবার নদীভাঙনের সময় ফাতেমা জীবন বাজি রেখে নৌকাটি রক্ষা করেছিল। সেই ভালোবাসার স্ত্রী ফাতেমা কোথায় হারিয়ে গেল, যাকে সে খুঁজে পায়নি।
নামহীন কোনো এক নদীতে নৌকাটি ভাসছে। ভাসছে যেন কোনো পুরো বাংলাদেশ। এই নৌকার গল্পটি রূপকার্থে পুরো বাংলাদেশই দৃশ্যমান হয়। তবে কাহিনিতে রয়েছে নাটকীয়তা, নির্মাণে অনন্যসাধারণ নৈপুণ্য। আলী মাঝির স্বপ্নের নৌকার বিবরণ এবং সেই নৌকাটিও একসময় নদীভাঙনের ফলে খরস্রোতে গভীরে পানিতে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছিল, প্রায় ঠিক তখনই তার প্রিয়তম স্ত্রী ফাতেমা জীবন বাজি রেখে নৌকাটিকে রক্ষা করেছিল। যাত্রীদের মধ্যে অসমসাহসী বৈধন ও মাঝি- দুজনই যাত্রীদের রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। নববিবাহিত কাশেম-সকিনা নৌকার যাত্রী। সকিনা গুলিতে আহত আর তাকে জড়িয়ে গড়ে ওঠে একটি মর্মান্তিক কাহিনি। এর মধ্য দিয়ে তাদের প্রেমকাহিনিও ন্যারেশনে চলে আসে।
একদিন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর মানুষগুলো নৌকায় ঠাসাঠাসি করে আর থাকতে পারছে না। তারা একটি ঘাটে নামল এবং টিনের দোতলা বাড়িতে গিয়ে উঠল। সেখানে দোকান লুট করে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। আধা কাঁচা, আধা রান্না খাবার খায়। কাশেম পাঞ্জাবি ছিঁড়ে সাকিনার বুকে ব্যান্ডেজ করে দেয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে দোতলায় গিয়ে দেখে দুই তরুণীর ক্ষতবিক্ষত গলিত লাশ। তাদের শরীরে কোনো কাপড় নেই এবং গোপনাঙ্গে বেয়নটের ক্ষত। এই দৃশ্য দেখার পর তারা দ্রুত সেখান থেকে আবার নৌকোয় ওঠে।
পরের দিন ওরা চর বাহাত্তুর নামে একটি গ্রামে গিয়ে ওঠে। এই গ্রামেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা শুনতে পায়, শুনতে পায় মুক্তিবাহিনীর বিজয় সংবাদ। বৈধন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। মনে হয় তার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে এবং মুক্তিযোদ্ধা হয়ে পাকসেনাদের খতম করছে। গ্রামে কালীকিংকর নামে একজন ডাক্তার পাওয়া গেল, যিনি সাকিনার ব্যান্ডেজ করে দেন। এই গ্রামও আক্রান্ত হলে ওরা আবার নৌকোয় চলতে থাকে। মানুষ একসঙ্গে থাকলে নানা রকম মিথস্ক্রিয়া ঘটে, এটা খুব স্বাভাবিক। এই মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মানুষের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। আবিভর্‚ত হয় নেতৃত্বের। এই নৌকাতেও বৈধন নেতৃত্বের ভ‚মিকায় চলে আসে। সে চায় নৌকা ছেড়ে হেঁটে যেতে। কিন্তু আলী মাঝি কোনোভাবেই নৌকা ছাড়বে না। এই নৌকা তার প্রাণের চেয়ে প্রিয়। তার স্ত্রী ফাতেমা নৌকাটি রক্ষা করেছিল, সেই স্মৃতি তার কাছে বড় হয়ে ধরা দেয়।
আবার নৌকো চলছে। পথে আক্রান্ত ১২ জন মিলিটারি দ্বারা। তাদের দেখে নৌকোর যাত্রীরা পাটাতনের নিচে লুকোয়। চার ঘণ্টা পর মিলিটারিরা নৌকো থেকে নেমে গেলে ওরা পাটাতনের নিচ থেকে বের হয়। অত্যাশ্চর্যজনকভাবে কেউ একটি শব্দও করল না। কোনো শিশু পর্যন্ত কাঁদল না। কিন্তু নৌকোর যাত্রীদের বাঁচাতে একটি শিশুর কান্নার নমুনা টের পেয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে গর্ভধারিণী মা। সবার প্রাণ বাঁচানোর জন্যে মা নিজের হাতে সন্তানকে হত্যা করে। এমন নিদারুণ কষ্টের আখ্যান ও বর্ণনার ধরন বাংলা সাহিত্যে কটি পাওয়া যাবে তা অবশ্যই একটি প্রশ্ন।
পাঁচ দিনের মাথায় সাকিনা মারা গেলে কাশেম তাকে জড়িয়ে ধরে পড়ে থাকে প্রেমের ব্যাকুলতায়।
চেইনস্মোকার পচা মিয়া একটি ভিন্ন রকম চরিত্র, যে দেশভাগের সময় কলকাতায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছিল। ভাগ্যবিড়ম্বিত পচা যেন বেঁচেই আছে ধূমপান করার জন্য। নৌকায় সেও মারা যায়। মারা যায় বিবি হাওয়াও। নৌকাতেই মাঝির ইমামতিতে জানাজা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সাকিনার মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে কাশেমও ভেসে যায়। সলিলসমাধি হয় নবদম্পতির।
কতগুলো বিধ্বস্ত মানুষকে নিয়ে নৌকাটি চলতে থাকে সীমান্তের ওপারে, কলকাতার উদ্দেশে।
এই তো আখ্যান। এমনই একটি নিটোল ও গোছানো অনন্যসাধারণ আখ্যান, যা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ।