মোজাম্মেল হক নিয়োগী
‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের পোস্টমর্টেম
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সৈয়দ আব্দুর রহমান ফেরদৌসী ও আনোয়ারা বেগমের বড়ো ছেলে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৩০ সালের ১৪ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র নয় বছর বয়সে মাতৃবিয়োগ ঘটে। তারপর বিধবা খালা দ্বিতীয় মা হন। তিনি মাতৃস্নেহের অভাব ঘুচিয়ে দেন, মায়ের অভাব সিরাজ বুঝতে পারেননি। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজরা আট ভাই ছিলেন, প্রথম মায়ের চার ভাই এবং দ্বিতীয় মায়ের চার ভাই। অবাক কাণ্ড যে, তাঁরা আট ভাইই জন্মগতভাবে সাহিত্যপ্রতিভার অধিকারী, সাহিত্যচর্চায় ব্রতী এবং লেখালেখি জড়িত। সিরাজের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম গৃহিণী, কবি এবং তাঁর একটি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লাল শিমুলের দিন’। সিরাজের প্রথম উপন্যাস ‘কিংবদন্তীর নায়ক’ এটি হয়তো সেভাবে আলোচনায় আসেনি।
বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে সিরাজের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার তেমন উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ধরে নেওয়া যায় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন, ‘হলে হবে না হলে নাই’ এমন মনোভাবে। এ কারণে তার লেখাপড়ার তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে তৃতীয় বিভাগে বিএ পাস করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া যা-ই হোক না কেন তাঁর অপ্রাতিষ্ঠানিক বিশেষ করে শিল্পসাহিত্যসংগীতে পড়াশোনার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনেক বেশি এবং ‘অলীক পুরুষ’ উপন্যাসের মাধ্যমে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর প্রজ্ঞার গভীরতার প্রমাণ রেখেছেন যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অতিশয় গৌণ।
বিএ পাস করার পর মেদিনীপুরের পানিপারুলে কয়েক মাস সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন। তারপর কলকাতায় ইত্তেফাক পত্রিকায় সহসম্পাদক হন। ১৯৪৯ সালে দেশ পত্রিকায় ‘আমার বাউলবন্ধুরা’ প্রথম লেখা ছাপা হয়। ১৯৬২ সালে প্রথম দেশ পত্রিকায় তাঁর গল্প ‘ভালোবাসা ও ডাউন ট্রেন’ প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকায়র বার্তা বিভাগে চাকরি শুরু করেন। লেখালেখির শুরুর দিকে তিনি অনেক কবিতা লেখেন কিন্তু পরে কবিতার ময়দান থেকে কথাসাহিত্যের ময়দানে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আড়াইশ বই লিখেছেন। নিশিমৃগয়া, নিষিদ্ধ প্রান্তর, প্রেম ঘৃণা দাহ, কামনার সুখ-দুঃখ, আসমানতারা, সীমান্ত বাঘিনী, কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি, হেমন্তের বর্ণমালা, বসন্ততৃষ্ণা, নিষিদ্ধ অরণ্য, নটী নয়নতারা, প্রেমের নিষাদ প্রভৃতি পাঠকনন্দিত উপন্যাস।
সিরাজের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস নীলঘরের নটী (১৯৬৬), হিজলকন্যা (১৯৬৭), তৃণভ‚মি (১৯৭০), মায়ামৃদঙ্গ (১৯৭২), উত্তর জাহ্নবী (১৯৭৪), নিলয় না জানি (১৯৭৬)। তাঁর লেখা কিশোরদের জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ কর্নেল। তাঁর পরিবারই ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র, পরিবার থেকেই তার প্রজ্ঞার ভিত্তি তৈরি হয়। তিনি যৌবনের প্রারম্ভে লোকনাট্য দল ‘আলকাপ’-এ যুক্ত থাকার কারণে সংস্কৃতির চর্চার আরেকটি প্ল্যাটফরম পেয়ে যান এবং এই দলের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভুম, দুমকা প্রভৃতি এলাকার বিভিন্ন স্তরের ও শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশেছেন এবং পরিচিত হয়েছেন তাঁদের যাপিত জীবনের সঙ্গে। স্বচক্ষে দেখা নানান পেশা, শ্রেণি ও জাতের মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং বিচিত্র নিসর্গকে উপভোগ করার সুবাদে তাঁর লেখার জগৎ বিস্তৃত হয়। আলকাপ দলের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি লেখেন ‘মায়ামৃদঙ্গ’ নামে একটি আলোচিত উপন্যাস। তিনি ১৫০টি উপন্যাস ও ৩০০টি ছোটো গল্প লিখেছেন। ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এই মহান লেখকের জীবনাসন হয়।
অলীক মানুষ
বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের প্রচলিত ও প্রথাগত ছকভাঙা নতুন ধারায় কোলাজধর্মী ধ্রুপদী উপন্যাস। স্বল্প পরিসরের পঠনপাঠনের মধ্যে এমন ছকভাঙা উপন্যাস আর একটিও চোখে পড়েনি। কাহিনির ভিত্তিতে রয়েছে ধর্ম ও মার্কসবাদী দর্শনের বাস্তবতার দ্বান্দ্বিকতা, ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের সক্রিয়তা, ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের সম্প্রদায়গত মতানৈক্য এবং ইসলাম ধর্মের মিথ ও অলীক কল্পনার জটিল রসায়ন। এগুলো ছাড়াও আখ্যান জুড়ে সরেস অনুঘটক হিসেবে রয়েছে পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থের বাণী এবং পৃথিবীর বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিকি ও দার্শনিকের প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি। বাস্তবতা ও অলীক ঘটনার মিশ্রণে রাঢ় বঙ্গের গ্রামীণ ও ধর্মীয় সংস্কৃতির আবহে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসের পটভূমিতে কাহিনি সৃষ্টিতে রয়েছে নানা রকম চমক।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ জন্মগতভাবে শিল্পী ও লেখক সত্তার অধিকারী রাঢ় বঙ্গের আলোবাতাসে মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্যে একাত্ম হয়ে বড়ো হয়েছেন। এ কারণে তাঁর কথাসাহিত্যে রাঢ় বঙ্গের মানুষের বাস্তব জীবনাচার এবং নৈসর্গিক রূপমাধুর্য বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। তিনি শৈশব থেকে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন, বাঁশিতে তুলতে পারতেন মায়াবী সুর। পরবর্তীকালে তাঁর মায়াবী বাঁশির সুরই কলকাতায় বড়ো বড়ো লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।
জাহিরুল হাসান রচিত লেখকের প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ ‘সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও বাঙালি সমাজ’, সোহারাব হোসেন রচিত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘অলীক মানুষ উপন্যাসের অন্দর-বাহির’ পাঠ, কালি ও কলমে প্রকাশিত প্রবন্ধ, ইন্টারনেট এবং সিরাজের ছোটো ভাই কবি সৈয়দ হাসমত জালালের সঙ্গে অনুপ্রাণন প্রকাশন কার্যালয়ে তাঁদের পারিবারিক জীবন ও ‘অলীক মানুষ’ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর জানা যায় যে, তাঁদের পরিবারের পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস যেমন চমকপ্রদ ঠিক তেমনি শিক্ষাদীক্ষায় ঐশ্বর্যপূর্ণ। বিত্তবৈভব বলতে ছিল অসংখ্য কেতাব যেগুলো বাড়ি বদলের সময় শুধু বই স্থানান্তরের জন্য কয়েকটি গরুর গাড়ির প্রয়োজন হতো। সিরাজের পিতামহ ছিলেন ধর্মপ্রাণ সুশিক্ষিত, সেকুলার ও আধুনিকমনস্ক ফরাজি মুসলমান। সিরাজের বাবাও ধর্মপ্রাণ মুসলাম হয়েও সেকুলার মনোভাবের আধুনিক মানুষ ছিলেন, রাজনীতিবিদ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। নেতাজি সুভাষ বসুর সঙ্গে একই মঞ্চে তাঁর ছবিও রয়েছে। সিরাজের মা আনোয়ারা বেগমের ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দ্বিতীয় শ্রেণিতে থেমে গেলেও বাবার পারিবারিক লাইব্রেরিতে থাকা অসংখ্য বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল এবং তিনি একাগ্রতার সঙ্গে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার গ্রন্থাদি পড়তেন। বিয়ের আগে তাঁর অর্থাৎ সিরাজের মা আনোয়ারা বেগমের লেখা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আনোয়ারা বেগমের কবিতা, গজল ও প্রবন্ধাদি তখনকার সময়ে নামিদামি পত্রিকায় ছাপা হতো। সিরাজের বাবা সৈয়দ আবদুর রহমান ফেরদৌসী স্কুলে পড়ার সময় মহাত্মা গান্ধিজির ডাকে স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং পরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন কিনা জানা যায়নি। তিনি তিনশ’ পৃষ্ঠার অধিক ‘মদিনা থেকে মুর্শিদাবাদ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস উৎকীর্ণ হয়েছে। তাঁর তথ্যাদিতে সাতান্ন পুরুষের বংশতালিকা থেকে জানা যায় যে, তাঁদের পরিবারের শিকড় আরব ভ‚মিতে এবং হজরত আলির বংশধর। বিস্ময়ের বিষয় যে, তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস যেন রাজাবাদশার কিংবা পির আওলিয়াদের ইতিহাসকেও ছাপিয়ে যায়। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’, ‘বৈতালিক’, ‘হিজলকন্যা’ এবং বেশ কিছু গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর পারিবারিক ইতিহাস এবং সিরাজের গ্রামের যাপিত জীবন সম্পর্কে জানা অত্যাবশ্যক। ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বদিউজ্জামান সিরাজের দাদাজি ছায়া অবলম্বনে চিত্রিত। এই কথা লেখক এবং লেখকের ভাই কবি সৈয়দ হাসমত জালালও স্বীকার করেছেন। বদিউজ্জামানের কনিষ্ঠ পুত্র শফিউজ্জামান শফির চরিত্র সিরাজের বাবার চরিত্রের হালকাপাতলা ছায়া দেখা যায় তবে লেখক এই ব্যাপারে মুখ খুলেননি। এই দুটি চরিত্র ছাড়াও বদিউজ্জামানের ছোটো ভাই ফরিদউজ্জামানের চরিত্রটির প্রত্যক্ষ ছায়া মিলে সিরাজের পিতামহীর পিতামহ ওস্তাদ সানোয়ার উদ্দিনের মধ্যে। ওস্তাদ সানোয়ার উদ্দিন ছিলেন সংগীতপাগল মানুষ এবং সংগীতচর্চার জন্য লৌখনোতে গিয়ে বিশ জন ওস্তাদের কাছে সংগীত শিখে শ্রাস্ত্রজ্ঞ হন। তিনি বাবরি চুল রাখতেন এবং গেরুয়া পোশাক পড়তেন। এগুলো তাঁর পাঁচ ধার্মিক ছেলে মেনে নিতে পারেননি; তাঁরা বাবার চুলদাড়ি কেটে দেন এবং গেরুয়া পোশাক ছাড়তে বলেন। ওই সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে হারিয়েছিলেন, তাঁর জ্ঞান আর ফেরেনি। ওই চরিত্রটি যেমন বিস্ময়কর তেমনি ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে শিল্প-সাহিত্যের নিষ্ঠাবান একজন মানুষের করুণ পরিণতি একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। ওস্তাদ সানোয়ার উদ্দিনের নাতনি শরিফ-উন-নিসা সিরাজের দাদি। কয়েকটি চরিত্রের মধ্যে তাঁদের পারিবারিক জীবনের ছায়া উপলব্ধি করা যায়। একইসঙ্গে খোসবাসপুর গ্রামের আশপাশের গ্রাম, জল ও অরণ্যভূমি যেমন- দ্বারকা ও ময়ূরাক্ষী নদী, গোকর্ণ হিজল ইত্যাদি এলাকার তৎকালীন নিসর্গের যে বর্ণনা ‘অলীক পুরুষে’ উৎকীর্ণ হয়েছে তাতে লেখকের বাল্যজীবনের ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন লেখকের মতামত থেকে স্পষ্ট যে, লেখার জন্য লেখকের অভিজ্ঞতার ভিত্তির প্রয়োজন। যার অভিজ্ঞতা যত বেশি তার লেখা তত সমৃদ্ধ হয়। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজও বলেছেন যে, লেখা তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, অভিজ্ঞতা বলতে কী বোঝায়? যেসব চরিত্র ও কাহিনি সৃষ্টি করা হয় সেসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকতে হবে? তাহলে লেখকের কল্পনাশক্তি কতটুকু কাজ করে? এসব প্রশ্নের উত্তর তিনিই পাবেন যিনি উত্থাপন করেন বা করবেন? লেখকের শ্রুত একটি শব্দ, একটি ঘটনা কিংবা প্রত্যক্ষ করা নিসর্গের বর্ণনায় কল্পনার রং চড়ানো ছাড়া কোনো ভালো সাহিত্যকর্ম হতে পারে না। নিজের গ্রাম বা পরিবারের কাহিনি থেকেও ধ্রুপদী ধারা সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে। তবে স্বচক্ষে দেখা বা স্বকর্ণে শ্রুত বিষয়কে সরাসরি সাহিত্যের ক্যানভাসে উপস্থাপন করলে সেটি আর সাহিত্য থাকে না, সেটা হয়ে যায় প্রতিবেদন, কিংবা খবরের কাগজের খবর। অভিজ্ঞতা থেকে আখ্যানের ছায়াটুকু গ্রহণ করে তারপর নিজের পঠনপাঠন, উপলব্ধি, অর্জিত জ্ঞান ও কল্পনার আলোকে লেখার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ ও ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেন লেখক যা হয় পাঠকের কাছে আদৃত। যা দেখা হয় তাই যদি লেখা হয় সেগুলো নিঃসন্দেহে দুর্বল সাহিত্য। তবে এমনটি ভাবার কারণ নেই যে এই ধরনের সাহিত্যের পাঠক পাওয়া যাবে না; সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বা উঠতে পারে। বোদ্ধা পাঠক ও সমালোচকদের কাছে ‘যা দেখা হয় তা লেখা হয়’ এই ধরনের সাহিত্য সমাদর পাওয়ার কথা নয়। ‘বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে রচিত’ যে সব আখ্যান বা গ্রন্থ লেখা থাকে সে সব দুর্বল সাহিত্য, অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্ট। লেখক কতটুকু রং চড়াতে পারলেন, কতটুকু ভাষার ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পারলেন, মাল-মসলায় সুস্বাদু রন্ধনকর্ম হলো কিনা সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গটি এসেছে ‘অলীক পুরুষ’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটি লেখকের দাদাজির ছায়া অবলম্বনে সৃষ্টি- এই কথা থেকে। কিন্তু সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই উপন্যাসে যে রকম শিল্পরস, ভাষার ব্যঞ্জনা, কাহিনির বিন্যাস, চরিত্রগুলোর পারস্পরিক যৌক্তিক বিশ্বস্ত যোগসূত্রতা, দেশ ও কালের বাস্তবানুগ ঘটনাবলি রহস্যময় ক্যানভাসে যে বৈদগ্ধে ও নৈপুণ্যে সৃষ্টি করেছেন সেটিকে সাধারণ কোনো সাহিত্যকর্ম আখ্যা দেওয়ার অবকাশ নেই। তিনি কেবল আকর্ষণীয় কাহিনিই সৃষ্টি করেননি, প্রচলিত ধারার উপন্যাসের কাঠামো বা ছক ভেঙে একাকার করে একটি অভিনব কাঠামো বাংলা সাহিত্যে সংযোজন করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নতুন কিছু সৃষ্টি করা কোনো সহজ ঘটনা নয়, বড়ো দুর্লঙ্ঘন্য। এই জন্য লেখকের থাকে ঝুঁকি। এই ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য লেখকের সাহসেরও প্রয়োজন।
উপন্যাসের কাঠামো বিশ্লেষণ
উপন্যাসের আলোচনার প্রারম্ভেই এর কাঠামো নিয়ে একটি ধারণা দেওয়া যেতে পারে। আমাদের পঠিত মুদ্রণের গ্রন্থটিতে সংখ্যা দিয়ে কোনো অধ্যায়কে চিহ্নিত না করে একটি প্রতীকী ঘোড়া বা অন্যভাবে বললে গ্রামীণ মেলায় মাটির পুতুল ঘোড়ার প্রতিকৃতি দিয়ে অধ্যায়গুলো সূচিত হয়েছে এবং ঘোড়া প্রতীকসূচিত মোট তেইশটি অধ্যায়ের মধ্যে আরও অনেকগুলো পরিচ্ছেদ বা উপঅধ্যায়ের বলয়ে তিনশ কুড়ি পৃষ্ঠায় প্রায় দেড়শ’ বছরের সময়ের ব্যাপ্তিতে পূর্ণ উপন্যাসটি গৌতম রায়ের উন্নত শিল্পমানের প্রচ্ছদে মলাটবন্দি হয়েছে। সাহিত্যবোদ্ধারা কেন ‘অলীক পুরুষ’ উপন্যাসকে প্রচলিত ছকভাঙা ও কোলাজ প্রকৃতির বলেন? প্রথম কারণটি হলো সাধারণত, আমরা কোনো উপন্যাসের ন্যারেটর বা কথককে দুটি রূপে দেখতে পাই। একটি ‘নাম পুরুষ’ বা ‘থার্ড পারসন’ এবং অন্যটি ‘উত্তম পুরুষ’ বা ‘ফার্স্ট পারসন’। একই উপন্যাসে সাধারণত কথক বা ন্যারেটর থাকে একজন হয়তো ‘নাম পুরুষ’ নয়তো ‘উত্তম পুরুষ’। ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু নয়। যেমন- রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর একেক অধ্যায়ের কথক একেকজন। হালে, এ বছরের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হান কানের ‘দ্য ভেজিটারিয়েন’ উপন্যাসের তিনটি অংশের একটি অংশ উত্তম পুরুষে বর্ণিত। এটি চতুরঙ্গের মতো হলে ওইসব উপন্যাসের সঙ্গে এটির পার্থক্য কী? অথবা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে কী দাঁড়ায়? অনেক পার্থক্য আছে। আমরা পর্যায়ক্রমে পৃষ্ঠা উন্মোচন করছি।
উপরোল্লিখিত উপন্যাসের তিনটি উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ের কথক বা ন্যারেটর একজন। ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসে কোন চরিত্র কখন কথকের ভ‚মিকায় ক্যানভাসে ঢুকেছে তা অনেকটা দুর্বোধ্য হয়। গভীর মনোযোগী পাঠক ছাড়া ন্যারেটরের বিষয়টি দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে। এই উপন্যাসের কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায় বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন কথক বা ন্যারেটর। কোন অধ্যায়ে এবং কোন পরিচ্ছদের কথক বা ন্যারেটর কে তা দেখা যেতে পারে:
কথক
নাম পুরুষ (থার্ড পার্সন)- অধ্যায়: ১-৫, ৭-৮, ১০-১১, ১৩ (পরিচ্ছদ ৩), ১৬ (পরিচ্ছদ ১), ১৮, ১৯, ২০, ২৪ ও উপসংহার।
পির বদিউজ্জামন- অধ্যায়: ১৩ (পরিচ্ছদ ১, ৫-৯), ১৬ (পরিচ্ছদ ৩), ১৮, ২১
শফিউজ্জামান শফি- অধ্যায়: ৬, ৯. ১২, ১৩ (৪ পরিচ্ছদ), ১৪ (২ ও ৪ পরিচ্ছদ), ১৫ (২-৩), ১৭, ১৯, ২২, ২৩।
রুকু ও কচির সংলাপ (মুখ্য রুকু)- অধ্যায়: ১৪ (১ ও ৩ পরিচ্ছদ), ১৫ (পরিচ্ছদ ১ ও ৪), ১৬ (পরিচ্ছদ ২), ১৮ ও ২৩ (পরিচ্ছদ ২)।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রচলিত উপন্যাসের কাঠামোতে সাধারণত অধ্যায়ে পরিচ্ছদ থাকে না, বিভাজিত অধ্যায় থাকে। কিন্তু অলীক মানুষে কোনো কোনো অধ্যায়ে কয়েকটি পরিচ্ছদ রয়েছে এবং কথকেরও পরিবর্তন হয়েছে। অধ্যায় ১৮ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এই অধ্যায়ের কথক নাম পুরুষ, বদিউজ্জামান ও সংলাপ (মুখ্যত রুকু)।
যেহেতু এই কাহিনি উপন্যাসের ছকবাঁধা নিয়মে ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হয়নি বা নির্মিত হয়নি অর্থাৎ কাহিনির উত্তরণ, ক্লাইমেক্স এবং নিম্নগামী উপসংহারে সমাপ্তির নিয়ম মানা হয়নি সেহেতু কথকের পরিবর্তনের মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় রসব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়েছে। শফি ও রুকুর কথন চেতনাপ্রবাহ রীতিতে (stream of consciousness) বর্ণিত হওয়ায় গল্পটি আরও রঙিন হয়ে উঠেছে। শফির বর্ণনায় রুকুর প্রতি তার অনুভূতি এবং রুকুর বর্ণনায় শফির বীরত্বগাথা অভিনব কৌশলে উভয়ের প্রেমাকাঙ্ক্ষার অন্তর্দহনের যতটা শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সেটা হয়তো মামুলি বা প্রথাগত কাহিনির বর্ণনায় তেমনভাবে হয়ে উঠত না। শেকসপীয়ারের রোমিও জুলিয়েট এবং বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের প্রেম কাহিনির মধ্যে নিতাই ও বাসন্তীর প্রত্যক্ষ রসায়ন ও মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বিয়োগান্তিক মহৎ প্রেমকাহিনি সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু শফি ও রুকুর মধ্যে প্রত্যক্ষ মিথস্ক্রিয়া বা রসায়ন না থেকেও পারস্পরিক অনুভ‚তির শেষ বয়সের প্রকাশ এতটা প্রগঢ়তা লাভ করেছে যা যে কোনো বিয়োগান্তিক প্রেমকাহিনিকে ছাপিয়ে পাঠকের মনে খোদিত হতে পারে এবং এই বর্ণনায় রুকু ও শফি কথক হওয়াতে গল্পটি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
কাহিনি সংক্ষেপ
উপন্যাসের আলোচনা-পর্যালোচনা-বিশ্লেষণ করতে গেলে সার-সংক্ষেপ উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য যে, বিভিন্ন চরিত্র, ঘটনা ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপিত হতে পারে। এ কারণে ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের সার-সংক্ষেপ উল্লেখ করা হলো।
আধ্যাত্মিক পির এবং দ্বৈত চরিত্রের বদিউজ্জামানের ধর্মীয় ও সংসারজীবনকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার। আচার-আচরণে বদিউজ্জামান অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির, গুরুগম্ভীর মনোভাবের স্বল্পভাষী ওহাবী ও ফরাজী আন্দোলনের পরস্পর বিপরীত ধর্মীয় মতাদর্শকে ধারণ করতেন। ওহাবী ধর্মীয় চেতনার ধারণ করার কারণে বদিউজ্জামান একদিন খরগডাঙার খোঁড়াপিরের আস্তানা ভেঙে দিলেন। বনের পাখির মতো তাঁর নির্দিষ্ট সাকিন নেই; ঠাঁইনাড়া হওয়া ছিল তাঁর স্বভাব। পির হিসেবে মানুষের সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হন এবং এ কারণে জমিদার বা ধনাঢ্য মানুষের তাঁকে সপরিবারে থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা করত। তবে সম্পদের প্রতি তিনি ছিলেন নির্লোভ ও নির্মোহ। মুরিদদের দেওয়া জিনিসপত্র, টাকা পয়সা নিজে প্রয়োজনমতো ভোগ করে বাকিসব বিলিয়ে দিতেন বা মাদরাসা ও এতিমখানার জন্য খরচ করতেন। অথচ সম্পদের পাহাড় গড়ার মতো তাঁর সুযোগ ছিল। তাঁর স্ত্রী সাইদা, তিন পুত্র নুরুজ্জামান, মনিরুজ্জামান ও শফিউজ্জামান ওরফে শফি। শফি কিংবদন্তি বিপ্লবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। নুরুজ্জামান দেওবন্দে লেখাপড়া করে বড়ো মওলানা হয়েছিল। মনিরুজ্জামান মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাকে লেখক বা শফি অর্ধমানব আর অর্ধপশু হিসেবেও গণ্য করত। তার মুখ দিয়ে সব সময় লালা ঝরত, বাকপ্রতিবন্ধিতা থাকার কারণে একপ্রকার বিকট শব্দ করে মনের ভাব প্রকাশ করত। উপন্যাসের শেষের দিকে মনিরুজ্জামান কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। খরগডাঙার পিরের থান ভেঙে দিয়ে বদিউজ্জামান পরিবারসহ কুতুবপুর থেকে তল্পি গুটিয়ে সেকেড্ডায় আস্তানার পত্তনের জন্য একদিন রওনা হয়ে পথিমধ্যে একটি গরুগাড়ির ধুরি ভেঙে গেলে তাঁরা মৌলাহাট গ্রামে আটকা পড়েন এবং গ্রামবাসীদের অনুরোধে সে গ্রামেই বসতি স্থাপন করলেন। মূলত মৌলাহাট গ্রামের পটভ‚মিতে উপন্যাসের বিস্তার ও পরিসমাপ্তি ঘটে। এই গ্রামে ধনাঢ্য বিধবা নারী দরিয়া বিবির দুই যমজ কন্যা দিলরুখ ওরফে রুকু এবং দিল আফরোজ ওরফে রোজি ছিল। দুজনের মধ্যে রুকু ছিল বুদ্ধিমতী, সপ্রতিভ ও বাটপটু। কিশোরী রুকুর মনে শফির প্রতি ভালোবাসার টান অনুভব করত ঠিক তেমনি কিশোর শফিও রুকুর প্রতি টান অনুভব করত। তাদের প্রচ্ছন্ন ভালোবাসা দুজনই প্রেমের দহনে দগ্ধ হয়েছে আজীবন। শফি ছিল প্রতিভাবান ও বুদ্ধিদীপ্ত কিশোর। নুরুজ্জামান ও শফিউজ্জামানের সঙ্গে দুই কিশোরীর একসঙ্গে বিয়ে ঠিকও হয়েছিল। কিন্তু বাল্য বিয়ের বাদ সাধেন শফির শিক্ষাদীক্ষার অভিভাবক দরিয়া বিবির স্বামী তোফাজ্জল চৌধুরীর বন্ধু নবাব বাহাদুরের কাছারির দেওয়ান চৌধুরী আবদুল বারি ওরফে বারু মিয়া। একরোখা দরিয়াবিবির সিদ্ধান্তে নুরুজ্জামানের সঙ্গে রোজির এবং প্রতিবন্ধী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে রুকুর একই দিনে বিয়ে দিলেন। বারিচাচাজির পরামর্শে ছন্নছাড়া শফিকে হরিনমারায় স্কুলে ভর্তি করে দিলে সেখানে খন্দকার হাসমতের বাড়িতে লজিং থেকে হরিণমারা স্কুলে লেখাপড়া করত শফি। ওই গ্রামে পরিচয় হলো গাজি সাইদুর রহমানের সঙ্গে। ওনারা দুজনই ইংরেজি শিক্ষিত এবং দাপটের সঙ্গে ত্যাজি ঘোড়ায় চড়তেন, ছিল বন্দুকও। শফিকে ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজাল থেকে বের করে বাস্তবতা ও আধুনিক জগতের আলো দেখাতে তাঁরা দুজনের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। শফির ইংরেজি স্কুলে পড়ানোর জন্য বারিচাচাজি (বারু মিয়া) তাকে লালবাগ জমিদারের পারিবারিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিলেন। শফি ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ল। লালবাগ ছেড়ে চলে গেল নুরপুরে। এখানে গোবিন্দের বাড়িতে থাকত। দেখা হলো স্বাধীনবালার সঙ্গে। স্কুলে পড়ার সময় আসমা নামের এক বেগানা নারীর প্ররোচনায় শফি কৌমার্যের বিসর্জন দিয়েছিল কিন্তু এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য সে সারা জীবন অনুতপ্ত ছিল। রুকুর প্রেমে দগ্ধ শফি স্বাধীনবালা নামে এক লেজবিয়ানের টান অনুভব করত। আবার কাল্লুর স্ত্রী সিতারার প্রেমের উসকানিতে শফি সাড়া না দিলেও কিছুটা টান অনুভব করত। মূলত শফির জীবনে প্রেমভালোবাসা বা যৌনাক্সক্ষার আসমা ব্যতীত আর কোনো প্রমাণ নেই। শফি মোট পাঁচটি খুন করেছিল। দরিয়াবিবির সম্পত্তি কৌশলে নুরুজ্জামান হাতিয়ে নিলো এবং নুরুজ্জামান সপরিবারে খুলনায় চলে গেল। খুনের অপরাধে শফির ফাঁসি হলো। রুকুর ছেলের ঘরে নাতি খোকাও ছিল শফির মতো ডানপিঠে ও বিপ্লবী। আর নাতনিও কচি মেধাবী ও বুদ্ধিমতী যার জবানে গোঁড়ামির পরিবর্তে আধুনিকতা সুষ্পষ্ট, বিজ্ঞানমনস্কু। এই আখ্যানে অসংখ্য উপাখ্যানের ছড়াছাড়ি এবং শতাধিক চরিত্রের মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি নির্মিত। শফির মৃত্যুর চল্লিশ বছর পর রুকুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।
চরিত্রের ভিতর-বাহির
অলীক মানুষ উপন্যাসের চরিত্রগুলো বিছিন্নভাবে চিত্রিত হয়েছে আবার অনেক চরিত্র নতুনভাবে হঠাৎ যোগসূত্রহীনভাবে আবির্ভূত হয়ে পরে যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে। কোনো কোনো চরিত্র এক ঝলক দেখা দিয়ে আবার হারিয়ে গেছে। চরিত্রের সংখ্যাও কম নয়, সব চরিত্রকে মনে রাখা অমনোযোগী পাঠকের পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে শ’খানেক চরিত্র উপন্যাসের ক্যানভাসে থাকলেও কোনো কোনো চরিত্রের সঙ্গে দু’একবার পাঠকের সাক্ষাৎ মিলে। কোনো চরিত্রের উপস্থিতি একেবারে নেই তদুপরি পাঠকের মনে চরিত্রটিও ছায়া ফেলে এবং প্রশ্নের উদ্রেক করে চরিত্রটি কোথায় হারালো কিংবা তার অস্থিত্ব কেন চিত্রিত হয়নি। এমন একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র রুকুর ছেলে রফিকুজ্জামান। কৌশলী লেখক হয়তো শিল্পের খাতিরে রফিকুজ্জামানকে পর্দায় না এনেও পাঠকের চিন্তা ও ভাবনার জায়গাটি রেখে দিলেন। এই দিক থেকে এই ধরনের অনুপস্থিত চরিত্রও শিল্পের সৃষ্টি হতে পারে। গ্যাব্রিয়েলা মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ উপন্যাসে ফাহমিদার মেয়ে থাকলেও গল্পের আড়ালে রাখা হয়েছে এবং শেষের দিকে তাকে একবার পর্দায় হালকাভাবে দেখানো হয়েছে। গ্যাব্রিয়েলা আঁটসাঁট গল্পের মধ্যে থেকেছেন, অতিরিক্ত চরিত্রের জুড়ে দিয়ে গল্পের শক্ত গাঁথুনিকে ঢিলা করেননি। ফুলের ছবি তুলতে গেলে বাগানের সব ফুলের ছবি যেমন অনাবশ্যক তেমনি অশৈল্পিকও। তাই সব চরিত্রকে চিত্রিত করতে হবে তাও ঠিক নয়।
প্রচলিত ধারায় উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বা নায়ক বা প্রোটগনিস্ট শফিউজ্জামান ওরফে শফি এবং নায়িকা দিলরুখ ওরফে রুকু। শফি ও রুকুর ভালোবাসা অনঙ্কুরিত, চাপা কান্নায় তারা দুজনই সিক্ত। কিন্তু লেখক এই চাপা কান্নাকে কিছুটা প্রকাশ করেছেন শফির আত্মকথন ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে। বিমূর্ত অন্তর্দহন লেখক যে গভীর অনুভূতির শৈল্পিক ধারায় উপন্যাস জুড়ে যেভাবে চিত্রিত করেছেন তা হয়তো জলো প্রেমের বর্ণনার চেয়ে অনেকে উজ্জ্বল ও জ্যোতি ছড়ানো আলোকছটা। কোথায় যেন অন্তঃশীলা প্রবাহমান, কোথায় যেন অনভূতির শিহরন।
বদিউজ্জামান
বদিউজ্জামানের সম্পূর্ণ নাম ‘হজরত সৈয়দ আবুল কাশেম মুহম্মদ বদি-উজ্-জামান আল্-হুসাইনি আল্-খুরাসানি’ যাঁকে ভিত্তি করে অথবা অন্যভাবে বলা যেতে পারে, যাকে চিত্রিত করার জন্য ‘অলীক পুরুষ’ উপন্যাস রচিত। কাহিনি সংক্ষেপে ঠাঁইনাড়া বদিউজ্জামানের চরিত্রের একটি স্কেচ দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বভাবে নিভৃতচারী, একাগ্রে প্রার্থনার জন্য মসজিদে একাকী থাকা, মৃদু ও স্বল্পভাষী, নিজ সিদ্ধান্তে অবিচল অটল, দৃঢ় মনোবলের মানুষ নিঃসঙ্গ থাকতে পছন্দ করেন। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই এত্তেকাফে কাটিয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি স্থানে তাঁকে বেশি দিন থাকতে দেখা যায়নি। বিয়ের আগে তিনি কোনো এক নির্জন পাহাড়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন এবং বিয়ের পর বালিকা বধূকে রেখে পালিয়ে গিয়ে তিন বছর নিরুদিষ্ট ছিলেন। এরপর পদ্মার তীরবর্তী কাঁঠালিয়া গ্রামে সস্ত্রীক বসবাস শুরু করেন। এই গ্রামেই শফির জন্ম এবং শফির তিন বছর বয়সে কাঁঠালিয়া থেকে পোখরায় চলে যান এবং ওর পাঁচ বছর বয়সে পোখরা থেকে বিনুটি- গোবিন্দপুর চলে যান। দশ বছর বয়সে নবাবগঞ্জ, বারো বছর বয়সে কুতুবপুর, ষোলোতে খয়রাডাঙ্গা, সতেরো বছরে খয়রাডাঙ্গা থেকে মৌলাহাট। মৌলাহাট থেকে তিনি নুরপুরও কিছু দিন ছিলেন। সেখানে ইকরাতুনকে বিয়েও করেন। তবে উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার ও পরিসমাপ্তি মূলত মৌলাহাট থেকে।
বউিদজ্জামানের পোট্রেটটি পুঙ্খানুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে হয়তো একটি পুস্তিকা হয়ে যাবে। তাই মোটা দাগে দেখার প্রয়াস চালানো হয়েছে। তাঁর পোর্টেটটি ধার্মিকতার চাদরে চরম বৈরাগ্যের এক প্রতিরূপ। বাংলা সাহিত্যে পির বা বুজুর্গ ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল সালু ও চাঁদের অমবস্যার উপন্যাস দুটির প্রধান চরিত্র দুটি হিপোক্রেট বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। অলীক পুরুষ পাঠের সময় এমন একটি হিপোক্রেট চরিত্রের ছায়া দেখা দিলেও কিংবা পাঠক হিপোক্রেট চরিত্র প্রত্যাশা করলে প্রকৃতপক্ষে বদিউজ্জামানের চরিত্রে হিপোক্রেসিকে ছাপিয়ে সংসাবৈরাগ্য, সম্পদঔদাস্য, কামপ্রবৃত্তিসংযমীর স্বরূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে পারতেন, রাজার হালে থাকতে পারতেনÑ কিন্তু তিনি তা করেননি। উপর্যুপরি মানুষের দেওয়া সম্পদ মুক্তহস্তে অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন। আধ্যাত্মবাদের পরম পরাকাষ্ঠা হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা যেত যদি না তিনি ইকরাকে বিয়ে করতেন। ইকরাকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে দুটি বিষয় লক্ষ করা যেতে পারে; প্রথমত ডাহিন ইকরাকে তিনি ধার্মিক বানাতে চেয়েছেন এবং লেখক এও প্রমাণ করেছেন যে, উত্তরাধুনিক ভাবধারায় অ্যাবসুলিউট বলে কিছু নেই। না-হয় এই বদিউজ্জামান অসংযত কামপ্রবৃত্তির কারণে ডাহিন ইকরাকে বিয়ে করেননি এবং তাঁর মধ্যে কামুকতার আভাস কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি নিজের স্ত্রী-পুত্রদের রেখে মসজিদে থেকে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন, স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের শিথিলতা সারা উপন্যাসেই বিরাজমান। তিনি কখনও ফতোয়া দিচ্ছেন, কখনও ধর্মীয় গোঁড়ামিতে বন্দি, আবার কখনও সমাজবাস্তবতাকে আঁকড়ে ধরেছেন। বিট্রিশদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে এই বিশ্বাস মনে পোষণ করলেও নিজে সক্রিয়ভাবে কোনো তৎপরতা দেখাননি। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, স্মার্ট, তুখোড় মেধাবী শফিকে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় সঁপে দিলেন যেন সে ইংরেজি শিখে ইংরেজদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে সে প্রত্যাশায়। তাঁর অন্তরে বিশ্বাসের দুটি ধারা প্রবাহিত: একটি আধ্যাত্মিকতা এবং অন্যটি আধুনিকতা। আধুনিক ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ধর্মকর্ম করে না তা তিনি জ্ঞাত থেকেও শফিকে কেন ধর্মীয় লেখাপড়ায় কিংবা ধর্মীয় কাজে উৎসাহিত না করে চৌধুরীর সাহেবের হাতে ছেড়ে দিলেন এই প্রশ্নটি দেখা দিতে পারে। আবার দেওবন্দে পড়ুয়ার প্রচ্ছন্ন ভিখারি তৈরি হয় জেনেও তিনি কেন আলীগড়ে না পড়িয়ে বড়ো ছেলে নুরুজ্জামানকে দেওয়াবন্দে পড়তে পাঠালেন এটি আরেকটি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। নিজে বুজুর্গ পির হয়ে সমাজের মানুষের দায়িত্ব নিয়ে আলোর পথ দেখান ঠিকই কিন্তু নিজের সন্তানদের প্রতি তিনি কি যথাযথ কর্তব্য পালন করেছেন? শফি কেন তাঁর বাধ্য থাকেনি? পিতা হিসেবে কি তিনি ব্যর্থ? এসব প্রশ্নের উত্তর পাঠককে খুঁজে নিতে হবে।
বদিপির নিজে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইতেন কিন্তু তাঁর কথার অবাধ্য হলে সেখানে তিনি আর থাকতেন না। তিনি যখন খয়রাডাঙ্গায় ছিলেন সেখানকার জমিদার আশরাফ খান চৌধুরী তাঁকে পাকা বাড়ি, ইঁদারার সুবিধাসহ জমিজমা দিয়ে তাঁকে থাকতে দিয়েছিলেন। বদিপির গানবাজনা ও খোঁড়া পিরের মাজারে কার্যক্রম হারাম বলে ফতোয়া দিলেন। কিন্তু আশরাফ খান চৌধুরী সংগীতানুরাগী ছিলেন, তিনি গানবাজনা বন্ধ করেননি, মাদরাসার ছাত্রদের দিয়ে উপন্যাস পড়িয়ে তিনি শুনতেন যা বদিপির মেনে নিতে পারেননি এবং খয়রাডাঙ্গায় এক বছর থেকে মৌলাহাটে এসে থিতু হলেন।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপরই তার চরিত্রটি নির্মিত। বদিপির একদিকে শরিয়তপন্থি, অন্যদিকে সংসাবৈরাগ্যÑ দুটি পরস্পর বিরোধী বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে বিদ্যমান। উদাসীন্য, বৈরাগ্য, আধ্যাত্মিকতা, অলৌকিকতা ইত্যাদি অতিন্দ্রিয়িক বিষয়বালি তাঁর বিশ্বাসের প্রধান ধারা, পক্ষান্তরে, জীবনবাস্তবতা এবং কিছুটা রাজনীতির ঈষৎ মিশ্রণ। শেষাবধি, শফি বেপথু হওয়াতে তিনি তাকে অভিশপ্ত হিসেবেই ত্যাগ করেন এবং তাকে জীবন ও সংসারমুখী করার কোনো উদ্যোগ নেননি। একজন শরিয়তপন্থি আদর্শ ও মহৎ পিতা হলে পিতৃত্বের মমতা দিয়ে উচ্ছৃঙ্খল শফিকে নিজের তত্ত¡বধানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতেন। সংসার-বৈরাগ্যের কারণে রুকুর মতো বুদ্ধিমতী ও স্মার্ট মেয়েকে শফির প্রেমিকাকে প্রতিবন্ধী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে বিয়ে দিতেন না। এ ক্ষেত্রে তিনি বিবেকবর্জিত। এই বিয়ের কারণে রুকু ও শফি দুজনই অন্তর্দহনে আমৃত্যু দগ্ধ হয়েছে। তিনি ইকরাকে বিয়ে করেছেন আবার তার দ্বিচারিতার কারণে কতোল করার হুকুম দিয়েছেন। শরিয়া বিধানে তিনি কতোল করেছেন কিন্তু দেশের আইনে কি তিনি মুক্তি পাবেন? এ-রকম আরেকটি প্রশ্নও এখানে রয়ে যায়। তারপরও বলা যায় ইকরাকে কতোল করার জন্য তিনি অনুতপ্ত এবং মৃত্যুর পর তাঁর নেকির অধাংশ ইকরাকে দিয়ে দেবেন বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন। এই ঘটনাটি অলৌকিক ও আধ্যাত্মিকার আলোকে তিনি মহত্ত্বে উদ্ভাসিত। তাঁর ছোটো ভাই ফরিদুজ্জামান ছিলেন বুজুর্গ ব্যক্তি কিন্তু মারফতির গৃহত্যাগী ফকির, তিনি চুলদাড়ি লম্বা করে রাখতেন এবং একদিন বদিউজ্জামান তাঁর চুলদাড়ি কেটে শরিয়তি হতে বাধ্য করলেন। কিন্তু ফরিদ বড়ো ভাইয়ের কথায় ফিরলেন না এবং পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন। তাঁর মা কোনো দিন দেখতে পাননি। অনেক দিন পর বদিউজ্জামানের মসজিদের পাশে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর মৃত্যুতে বদিউজ্জামান অনুতপ্ত ছিলেন।
ময়ূরমুখো ছড়ি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বদিপিরের স্ববিরোধিতা মনোভাবের প্রকাশ পেয়েছে। কেননা তিনি মূর্তি বা ছবিকে হারাম বলে ফতোয়া দেন আবার নিজেই ময়ূরের মুখাঙ্কিত ছড়ি, অর্থাৎ প্রাণীর মূর্তি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। জিনকে বাস্তবে তিনি কি কখনও দেখেছেন নাকি তা অলীকই থেকে গেল, বাস্তবে জিনের কোনো প্রমাণ উপন্যাসে না থাকলেও তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস করেছেন জিনের অবস্থান। ইসলাম ধর্মানুসারীরা অবশ্যই জিনের অস্থিত্ব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।
পাহাড়ের গুহায়, বনজঙ্গলের ভেতরে কুটিরে ধ্যনমগ্ন থাকার জন্য তিনি প্রায়ই এত্তেকাফে বসতেন। এক বৃষ্টিমুখর রাতে স্ত্রীর সান্নিধ্য পেতে মসজিদ ছেড়ে বাড়িতে গেলে সাইদার নিস্পৃহতায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে চপেটাঘাত করে নারীর মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করেছেন। তবে ওই মুহূর্তের জন্য একজন পুরুষের এহেন আচরণ অবান্তর নয় তিনি যদিও পির তদুপরি। ওই রাতেই তিনি গৃহত্যাগ করে মসজিদে চলে গেলেন। কিন্তু এরপরও, শেষ বয়সে স্ত্রীর হাতের রান্না খাওয়ার জন্য তিনি মসজিদ থেকে চিরকুট পাঠিয়েছিলেন; সাইদা নিজের হাতে রান্না করে বোরখা পরে মসজিদে খাবার দিয়ে আসতেন।
অলীক মানুষ উপন্যাসে বদিউজ্জামানের চরিত্রটি নিঃসন্দেহে একটি অনবদ্য, অসামান্য কীর্তি যা বাংলা সাহিত্যের দেওয়ালে খোদিত হয়ে থাকবে।
সাইদা
সাইদার পিতৃমাতৃর সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের তাঁকে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বড়ো ভাইয়ের পরিচয় বিশাল আকাশে একটি আবছা ক্ষীণ আলোর রেখার মতো পাওয়া যায়। লেখক ক্যানভাসে বেশি জায়গা দিতে নারাজ ছিলেন হয়তো। তাঁর বড়ো ভাই মাদকাসক্ত মির আবু তৈয়ব প্রতাপালী, ডাকাত সর্দারাও পর্যন্ত তাকে ভয় পেত। দুটি বিয়ে করেন এবং প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। ভ্রাতা-ভগ্নির সম্পর্ক অত্যন্ত শিথিল, উপন্যাসের পাতায় তাদের দুজনের একবার একটি বিরোধপূর্ণ পরিবেশে সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। এ পর্যন্তই শফির বয়ানে পাওয়া যায় যখন শফি পান্না পেশোয়ারিকে খুন করে পালিয়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিতে গিয়েছিল কিন্তু বৈরি পরিবেশ এবং মামার অনাত্মীয়ের মতো আচরণের কারণে সেখান থেকে চলে গেল। বদিউজ্জামানের স্ত্রী সাইদা পিরের স্ত্রী হিসেবে সর্বংসহা নারী হয়েও স্বামীর অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে তাঁকে তিনবার বিদ্রোহ করতে দেখা যায়। তাঁকে আধ্যাত্মিকতার মোড়কে পতিব্রতে নিঃশব্দে স্বামীর অবহেলা ও অবজ্ঞা তিনি মেনে নেননি। তিনি বুকে পাথর চেপে সংসার করেছেন। এই দম্পতির বৈবাহিক জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলো সম্পর্কে লেখক বর্ণনা করেননি। বাল্য বিয়ে হয়েছিল এবং বিয়ের পরই বালিকা বধূকে ফেলে বদিপির তিন বছরের জন্য উধাও। আখ্যানের শুরু হয়েছে তাদের প্রায় মধ্যজীবন থেকে। এ-কারণে দম্পত্তির প্রেমভালোবাসা, সংসারজীবন পর্দার আড়ালে রয়ে গেল। সমাজবাস্তবতার আলোকে এই নারী চরিত্রে মহৎ মাতৃত্বের রূপ সফলভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে। আদরের সন্তান শফি বাড়িতে থাকা পর্যন্ত তাঁকে সুখী মা হিসেবে দেখা যায় কিন্তু শফির বাড়ি ত্যাগের পর থেকে তাঁর মধ্যে অন্তর্দহন সৃষ্টি হয় যে দহনের নির্মম শিখায় তিনি তিলে তিলে দগ্ধ হয়েছেন। সহ্যেরও সীমা থাকে, সেই সীমা অতিক্রান্ত হলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। লেখক সযতনে সাইদাকে শেষপর্যন্ত ঘুরে দাঁড় করালেন এবং শিল্পনৈপুণ্যে সাইদাকে স্বামীর আশ্রমে অর্থাৎ মসজিদে পাঠিয়ে প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। নারীরা যে প্রতিবাদী হতে পারে এই চরিত্রে সামান্য প্রতিফলিত হয়েছে যদিও আরও তিনটি নারী চরিত্রকে তিনি বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন। সাইদার কয়েকটি প্রতিবাদ: প্রথম প্রতিবাদ করেন বাড়ির চাকর দুখু মিয়ার ভাগ্নে ফজুকে বাঁশি বাঁজানোর অপরাধে পিটিয়ে বরইগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হলে সাইদা রাতে গিয়ে ফজুর বাঁধন খুলে মুক্ত করে দিলেন। পির বদিউজ্জামান মসজিদে থেকে ইবাদত-বন্দেগি করতেন, স্বগৃহে কদাচিৎ আসতেন। স্বামীকে কাছে পাওয়ার প্রত্যাশায় তিনি প্রতিদিন দিনই অপেক্ষা করতেন। এক বর্ষণমুখর রাতে পির সাহেব স্ত্রীসঙ্গের আশায় ভিজে বাড়ি এলেও সাইদার নিস্পৃতায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে শরীরে চপেটাঘাত করলেন। নিস্পৃহতা ছিল তাঁর প্রতিবাদ। প্রতিবন্ধী ছেলে মনিরুজ্জামানের ছেলে সন্তান হলে মসজিদ থেকে পির বদিউজ্জামান ‘কামরুজ্জামান’ নাম রাখার জন্য একটি কাগজে লিখে সাইদার কাছে পাঠালে তিনি সেটি ছিঁড়ে ফেলে দিলেন এবং ওর নাম রাখেন রফিকুজ্জামান। রফিকুজ্জামানকে সংক্ষেপে ‘রফি’ ডাকা হতো। সাইদা ছিলেন অত্যন্ত মানবিক। মসজিদে থাকার সময় রুকুর রান্নার চেয়ে সাইদার রান্নার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করলে সাইদা বোরখা পরে স্বামীর জন্য খাবার দিয়ে আসতেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনের উষ্ণতা নেই, সম্পূর্ণ উপন্যাসে শীতল আবহে দাম্পত্য জীবনকে উপস্থাপন করা হয়েছে। শফির জন্য তাঁর হাহাকার থাকলেও অন্য দুই সন্তানের প্রতি কোনো বৈরি মনোভাব প্রকাশ পায়নি। অবশ্যই শফির জন্য তাঁর আন্তরিক টান বেশি থাকারই কথা। কারণ শফি সব সময় মায়ের কাছে ছিল, সে দুরন্ত স্মার্ট ও প্রতিভাবান। প্রকৃতির নিয়মেই প্রথম ও শেষ সন্তানের প্রতি মা-বাবার বেশি টান থাকে। শফির প্রতিও তাই ছিল। মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দুয়েকবার উন্মাষিক মনোভাব প্রকাশ পেলেও অবজ্ঞা বা অবহেলা ছিল না বরং নিজের কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ছিল। আদর্শিক ও মানবিক কারণে সাইদা এই উপন্যাসের একটি মহৎ চরিত্র।
শফিউজ্জামান ওরফে শফি
পদ্মার তীরবর্তী কাঁঠালিয়া গ্রামে শফির জন্ম, তারপর ঠাঁইনাড়া চলে পরিবারের সঙ্গে। কুতুবপুরে নিসিং পণ্ডিতের পাঠশালায় তার লেখাপড়ার শুরু হয় যে পাঠশালায় মুসলমানদের পড়া নিষেধ থাকলেও পির সাহেবের ছেলে হয়তো ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। পণ্ডিতের বেত্রাঘাত তাকে সহ্য করতে হতো। বৃত্তি পরীক্ষার আগেই কুতুবপুর থেকে খয়রাডাঙ্গায় স্থানান্তর যখন শফির বয়স ষোলো বছর এবং সতেরো বছরে মৌলাহাটে স্থানান্তর। উপন্যাসে সতেরো বছর বয়স থেকে মূলত শফির চরিত্রটি বিকশিত হয়েছে। সেই সময়কার বৃত্তি পরীক্ষা বলতে কী বুঝায় তাও আমাদের বোধগম্য নয়। সতেরো বছর বয়সে শফি হরিণমারায় কোন শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, সেখানে কত দিন ছিল এবং সেখান থেকে লালবাগে কোন শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল এগুলো অনুল্লেখ থাকায় শফির বয়স ও শিক্ষাদীক্ষার সঙ্গে কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করতে ধোঁয়াশা দেখা দিতে পারে। যেহেতু খয়রাডাঙ্গা ও মৌলহাটে শফি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রকার পাঠ্যক্রমে বা পাঠচক্রেও ছিল না সেহেতু ধরে নেওয়া যায় সে ঘুরে বেরিয়েছে। বারি চৌধুরী আবদারের পরিপ্রেক্ষিতে বদিপির শফিকে ‘হরিণমারা প্রসন্নময়ী হাই ইংলিশ স্কুলে’ পাঠান যেখানে সে খন্দাকার হাসমতের বাড়িতে লজিং থেকে তার লেখাপড়া শুরু হলো।
হরিণমারার থেকে বড়ো গাজির ইচ্ছায় সে লালবাগ নবাব বাহাদুরের পারিবারিক ইংরেজি শিক্ষা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিল। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল নমনীয়, বাধাধরা কঠোর নিয়ম ছিল না। শফির চরিত্রের উত্তরণ, অর্থাৎ জীবনের মোড় ঘুরে লালবাগ থেকে। সহপাঠী বিড্ডু এবং কাল্লুর ভাই চুল্লুর সঙ্গে মিশে লালবাগের অলিগলি, এমনকি বেশ্যালয় পর্যন্ত চিনতে শুরু করল, তামাক সেবন করাও শিখল।
উপন্যাসের প্রাণভোমরা শফিউজ্জামান ওরফে শফি কেন্দ্রীয় চরিত্র, পাঁচটি খুনের আসামি। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। প্রথাগত নিয়মে চরিত্রটির কাহিনিতে বেড়ে ওঠা এবং মৃত্যু দিয়ে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি টানেননি কৌশলী লেখক। শফির চরিত্রটি সৃষ্টিতে লেখকের অন্যান্য উপন্যাসের মতো নয়; এতে রয়েছে স্বাতন্ত্র্য এবং কাহিনি বিন্যাসে লেখকের প্রজ্ঞা ও নিখুঁত শিল্পরসবোধ। উপন্যাসের প্রথম বাক্যই শফির চরিত্রের : ‘দায়রা জজ ফাঁসির হুকুম দিলে আসামি শফিউজ্জামানের একজন কালো আর একজন শাদা মানুষকে মনে পড়ে গিয়েছিল। এদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুরা চারদিকে অসংখ্য কালো মানুষ দেখতে-দেখতে বড় হয় এবং নিজেরাও কালো হতে থাকে। কিন্তু শাদা মানুষ, যার লোম ভুরু ও চুলও প্রচণ্ড শাদা, ভীষণ চমকে দেয়।’ প্রথম প্যারাগ্রাফটি একই সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ যাতে সম্পূর্ণ উপন্যাসের একটি সারগর্ভ প্রথম নিহিত রয়েছে; উপন্যাস পাঠ শেষে বাক্যটি গুরুত্ব আরও বেশি ধরা পড়ে। কালো মানুষ এবং সাদা মানুষকে পরবর্তীকালে কালো জিন ও সাদা জিন হিসেবে দেখা যায়। কালো জিন পাপের বা শয়তানের প্রতীক এবং সাদা জিন ফেরেশতা বা পুণ্যবানের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা রয়েছে। এই কালো ও শাদা মানুষ প্রকৃতপক্ষে রূপকার্থে লেখক ব্যবহার করেছেন, যে সমাজে পাপাচারে লিপ্ত মানুষের সংখ্যা বেশি যাদের দেখে শিশুরা বেড়ে ওঠে এবং শাদা মানুষের অর্থাৎ পুণ্যবানের সংখ্যা যা সচরাচার শিশুদের সঙ্গে দেখা হয় না। প্রথম বাক্যতে উপন্যাসে অতীত বর্ণিত হয়েছে এমন ধারণা পাওয়া খুব স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে, গ্যাব্রিয়েলা মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি: ‘Many Years Later, as he faced the firing squad, Colonel Aureliano Buendia was to remember that distant afternoon when his father took him to discover ice.’ সাজুয্য লক্ষ করা যায়। এই বাক্যেও লেখক উপন্যাটির ভেতরের বিষয়বস্তুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। শফিকের বাবা বদিউজ্জামান পরিবারকে নিয়ে খয়রাডাঙ্গা থেকে ঠাঁইনেড়ে মৌলাহাট তখন পথ ভুলে গেলে একজন অদ্ভুত ধরনের কালো মানুষকে দেখতে পেয়ে পথের সন্ধান করলে সে গরুগাড়ির বহরকে একটি ভুল পথ দেখিয়ে দিলো। লোকটি গলার আওয়াজ ছিল খনখনে ও বিকট। এরপর ভুল পথ থেকে মৌলাহাটে যাওয়ার সঠিক পথটিকে দেখায় একজন শাদা মানুষ যার কণ্ঠ সুমিষ্ট। ব্যবহার ছিল ও বিনয়ী-ভদ্র। এই কালো ও শাদা মানুষের ঘটনার মধ্য দিয়ে লেখক সমাজের ভালো-মন্দ মানুষের পরিচয় করিয়ে দিলেন যে রূপকটি উপন্যাসের প্রথম প্যারাতেই উৎকীর্ণ হয়েছে। কালো-শাদা মানুষ দুজনকে ভালো জিন ও খারাপ জিন হিসেবে উপন্যাসে বর্ণনা করা হলেও বাস্তবে কি সত্যি এমন ঘটনা ঘটে? এই দুটি মানুষকেও অলীক মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শফির ফাঁসির হুকুমের সময় এই দুই মানুষের কথাও মনে পড়েছিল।
খয়রাডাঙ্গা থেকে সাকেড্ডা যাওয়ার পথে গরুগাড়ির ধুরি ভেঙে যাওয়াতে মৌলাহাটের একটি বাড়ির পাশে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ধুরি ঠিক করার জন্য তারা বিরতি নিচ্ছিল। সেই সময় বদিউজ্জামান পিরের খবর আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে অসংখ্য মানুষ তাঁকে সে গ্রামেই থাকার জন্য জোরালো দাবি জানায় যে দাবিকে তিনি উপেক্ষা করতে না পেরে সেখানেই থাকতে তিনিও রাজি হলেন। এই মৌলাহাট গ্রামেই তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন।
ধুরি মেরামত করার বিরতিতে পাশে একটি পুকুরে শফির সঙ্গে স্নানরতা দুই কিশোরীকে দেখতে পায়। তারা প্রয়াত তোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী ও দরিয়াবানু দম্পতির যমজ কন্যাদ্বয় দিলরুখ ওরফে রুকু ও দিল আফরোজ ওরফে রোজির সঙ্গে দেখা হলে অচেনা পথিকের সঙ্গে দুষ্টুমিভরা কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তিনজনের মধ্যে কিছুটা ভাব সঞ্চারিত হলো। তারা স্নান সেরে বাড়ি ফিরে পাশের বাড়ির আয়মনির বাড়িতে শফিকে খেতে দেখে বিস্মিত হলো এবং সেখানেও সামান্য কথাবার্তার মধ্যে ভাব বিনিময় হলো।
মৌলাহাট থাকা অবস্থায় তাদের মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হতো এবং চপলা ও বুদ্ধিমতী রুকুর সঙ্গে শফির অন্মোচিত হৃদয়বৃত্তিক কিছুট ভাবের সৃষ্টি হলো। কিশোর বয়সের প্রেম যে-রকম হয়- অপ্রকাশিত। ‘মেয়েদের হাতের ছোঁয়া শফিকেও চমকে দিয়েছিল। বিশেষ করে রুকুর হাতের ছোঁয়া। তার মনে হয়েছিল, আরও কিছুক্ষণ হাতটা ধরে থাকল না কেন রুকু?’ দীর্ঘকাল পর অর্থা যৌবনে শফির অনুভ‚তির প্রকাশ।
শফি দুরন্ত, চৌকস, মেধাবী ও সুদর্শন। নবাব বাহাদুরের কাছারির দেওয়ান চৌধুরী আব্দুল বারির হাত ধরে শফি হরিণমারা স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। বারি চৌধুরী রুক-রোজির বাবার বন্ধু, রুকুদের বাড়িতেই শফির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি খন্দকার হাসমতের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করার ব্যবস্থা করে দিলেন। হরিণমারাতেই বড়ো গাজি সাইদুর এবং ছোটো গাজি মাইদুরের (বদি পীরের মুরিদ) সঙ্গে পরিচয় হলো শফির। গাজি সাইদুর ইংরেজি শিক্ষিত, সরকারি চাকুরে। হাসমতের ছেলে তার সহপাঠী রবিউদ্দিন যে ইতরামিতে দুই কাঠি উপরে, একসঙ্গে ওদের বৈঠকখানায় থাকত। রবিউদ্দিনের সংস্পর্শেই শফি প্রথম যৌনতার পাঠ গ্রহণ করল। বারি চৌধুরি ঘোড়া দৌড়ানো ও বন্দুক দিয়ে শিকার করার বিষয়গুলো কিশোর শফিকে প্রলুব্ধ করতে লাগল এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে সে প্রশিক্ষিতও হয়ে উঠল। রুকুদের পরিবারে শিক্ষিত মার্জিন ও রুচিশীল বারি চৌধুরীর প্রভাব থাকায় রুকু ও শফির বাল্যবিবাহ রোধ করে শফিকে আপত্যস্নেহে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এই স্বপ্নদ্রষ্টা কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ব্যর্থ সফল হয়নি।
হরিণমারা স্কুলে শফির ভালো লেখাপড়া ভালো হচ্ছিল না বলে তাকে বড়ো গাজি লালবাগ ‘নবাববাহাদুর ইনস্টিটিউটে’ ভর্তি করে দিলেন। এটি ইংরেজিচর্চার স্কুল। কাল্লু বারি চাচার দেহরক্ষী জাতীয় কোনো লোক কাল্লুর ছোটো ভাই চুল্লুর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। চুল্লু পিলখানার নোকর ছিল, দুর্ধর্ষ ছিল। সহপাঠী বিড্ডু গাঁজা খেত। পতিতালয়ে যেত। এই সম্পর্ক দুটি স্থায়ী হয়নি। বিড্ডুর বাবা ছিল কলকাতার কোনো বাড়ির খানসামা। চুল্লুর সঙ্গে মিশে তামাক টানাসহ অসামাজিক কাজের পাঠ গ্রহণ করেছে। লালবাগে জমিদার বাবুর ইংরেজি স্কুলে পড়ার সময় সে সমকামী চরিত্রহীন পান্না পেশোয়ারিকে খুন করে পালিয়ে বেড়াতে শুরু করল। তবে খুনের মোটিফ বিশ্লেষণ করলে সহজে অনুমেয় হয় যে, এই খুন ইচ্ছেকৃত ছিল না। সে দূর থেকে একটি ইট নিক্ষেপ করেছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পান্না পেশোয়ারি নিহত হয়েছিল। তখন তার মামা আবু তৈয়বের বাড়িতে গিয়েছিল হয়েতা আশ্রয়ের জন্য। কিন্তু আশ্রয় মিলেনি, সেখান থেকে ফেরার পথে দেবনারায়নের সঙ্গে দেখা হলে সে নুরপুরে চলে গেল। গ্রামটিকে ব্রহ্মপুর বলা হতো। এই গ্রামেই সে ধৃত না হওয়া পর্যন্ত ছিল।
কিশোর বয়সের রুকু ও শফির মধ্যে অপ্রকাশিত প্রেমের অন্তর্দহন ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় যৌবনে। অযাচিত ও আকস্মিকভাবে আসমা নামে (কসবি হিসেবে এলাকায় পরিচিত), গায়ক মেহেরুদ্দিন খামরুর স্ত্রীর সঙ্গে এক দুপুরে পরিচয় হলে আসমার প্ররোচনায় নদীর পাশে ঘনজঙ্গলে শফির কৌমার্যের স্খলন ঘটল। পরবর্তীকালে শফির তিনজন নারীর প্রতি আসক্তি প্রকাশ পেলেও প্রেম বা শারীরিক সম্পর্ক কোনোটাই হয়নি। মেঘলা আকাশে বিদ্যুতের ছটার মতো ছিল ওদের প্রতি শফির ভালো লাগার প্রকাশ। রুকুর অপ্রকাশিত ও অদৃশ্য প্রেমে শফি দগ্ধ হয়েছে আমৃত্যু।
শফি মোট পাঁচটি খুন করেছিল। প্রথমে কাল্লুর ছোটো বউ সিতারার সঙ্গে সখ্যের কারণে তার সম্ভ্রম রক্ষার্থে এবং নষ্ট চরিত্রের লম্পট পান্না পেশোয়ারিকে যখন দুই তরুণের শরীর টেপার সঙ্গ নিচ্ছিল তখন সে দূর থেকে ইট নিক্ষেপ করেছিল তার ক্ষোভ প্রশমনের জন্য। শফি পরে জানতে পারে ইটের আঘাতে পান্নার মৃত্যু হয়েছিল। শফির দ্বিতীয় খুন স্ট্যানলিকে। দেশপ্রেম ও ইংরেজদের অত্যাচারের চূড়ান্ত প্রতিবাদের মনোবৃত্তিতে স্ট্যানলিকে খুন করে শফি। নুরপুর কুঠির মালিক স্টানলি দাপুটে, ভয়ানক অত্যাচারী ও নির্যাতনকারী ছিল। এই খুন সে একা করেনি। প্রথমে হরিনারায়ণ ত্রিবেদীর পিস্তলের গুলিটি স্টানলির কাঁধে লেগে ঘোড়া থেকে একটি গর্তে গড়িয়ে পড়ল, দ্বিতীয় গুলি ফসকে যায় এবং তখন শফি তাকে তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করল। অবশ্যই স্টানলিকে খুন না করলে দুজনকেই স্টানলির পিস্তলের গুলিতে মরতে হতো।
তৃতীয় খুন আরেক ইংরেজকে। ‘নেটিভ কুত্তা’ বলে গালির দেওয়ার কারণে তাকে গুলি করে হত্যা করে শফি। চতুর্থ খুন কাল্লুকে। কাল্লুকে কেন খুন করেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি শফি। বরং বারি চাচাজিকে বলেছিল সে জানে না কেন খুন করেছে। পঞ্চম খুনটি মুন্সিজি আবদুর রহিম মুন্সিজিকে যিনি রত্মময়ী কন্যাস্নেহে লেখাপড়া করিয়ে বড়ো করতেছিলেন। তিনি রত্মময়ীকে জহর আরা ডাকতেন, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তাকে ক্রোধের বসে খুন করেছিল শফি। কাল্লু ও মুন্সিজির খুন দুটিতে আলবের কামুর ‘আউটসাইডার’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রে ম্যুরসোর খুনের প্রতিচ্ছায়া দেখা যায়। মুন্সিজির খুনটি প্রচণ্ড ক্রোধাগ্নির কারণে কিন্তু কাল্লুর ক্ষেত্রে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক উন্মোচিত হয়নি বরং ম্যুরসোর মতো ঠান্ডা মাথায় তাকে খুন করা হয়েছে। আউটসাইডার আখ্যানটি অ্যাবসার্ডিটিজমের মোড়কে আবৃত, এই হিসেবে এখানেও অ্যাবসার্ডিটিজম পরিলক্ষিত হয়।
ব্রাহ্মপুরে দেবনারায়ণ আচার্যের শফি পোশাকে-পরিচ্ছদের হিন্দু বা ব্রহ্ম ধর্মের মানুষে পরিণত হলেও তার কোনো ধর্ম ছিল না। শফি নিজেই জানিয়ে দিয়েছে তার কোনো ধর্ম নেই। দেবনারায়ণ রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রহ্মধর্মের অনুসারী ও প্রচারক ছিলেন। এখানে শফি একটি লাইব্রেরিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। একটি ঘোড়াও কিনেছিল। তার হাতে পিস্তল ছিল। দেশপ্রেমিক যামিনী বাবু যিনি ইংরেজকে মারতে গিয়ে নিহত হন তার কন্যা ও স্ত্রী ব্রাহ্মপুরে আশ্রয়ের জন্য এলে শফির সঙ্গে স্বাধীনবালার সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। রত্মময়ী, যাকে মুন্সিজি জোহরা ডাকত সে হিস্টিরিয়ার রোগী ছিল। রত্মময়ীর সঙ্গেও কিছুটা সম্পর্ক হয়েছিল, উন্নাষিক শফির কাছে প্রেম বসন্তের শিমুল তুলার মতোই উড়ে যায়। এই রত্মময়ীই শফির ফাঁসির খবরটি বদিপিরকে নিজের রক্ত দিয়ে লেখা খত (চিঠি) দিয়ে জানায়।
ইংরেজদের ভাষায় অ্যানার্কিস্ট শফি একদিন বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখল বাবা ‘এত্তেকাফে’। মসজিদের খাদেম জালাল উদ্দিন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু গোপনে পুলিশকে খবর দিয়ে ধরিয়েও দিলো। তারপর তারপর ফাঁসি হলো।
শফিকে স্বদেশপ্রেমী পুরোপুরি বিপ্লবী বলার সুযোগ নেই। সে বিপ্লবী হয়েও হতে পারেনি। পান্না, কাল্লু ও মুন্সিজিকে হত্যার মধ্য দিয়ে তাকে সিরিয়াল কিলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্টানলিকে হত্যা করে সে আত্মগ্লাানিতে ভুগেছে এই যে, স্বাধীনবালার বাবার প্রতিশোধ নিতে এসে তাকে প্ররোচিত করে খুন করিয়েছিল। জাতিসত্তার পরাকাষ্টা হিসেবে যে গোরা তাকে নেটিভ কুত্তা বলেছিল এটি বরং প্রকৃত দেশ ও জাতীয়তাবাদের প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যায়। যদি স্টানলিকে হত্যার পর সে আত্মগ্লানিতে না ভুগত তাহলে সেটিও দেশপ্রেমিক বিপ্লবী ক্ষুদিরামসহ অন্যান্য বিপ্লবীদের অনন্য দৃষ্টান্ত হতো। কিন্তু লেখক কেন তাকে সে রকম বিপ্লবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি তা অবশ্যই ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
নুরুজ্জামান
নুরুজ্জামান দেওবন্দে লেখাপড়া করে মৌলাহাটে এসে নিজেকে বড় মৌলানা হিসেবে জাহির করার জন্য আরবি, উর্দু ভাষার মিশ্রণে বিভিন্ন বয়ান দিত এমনকি পারিবারিক কথাবার্তাতেও আরবি উর্দু ভাষা ব্যবহার করত। মৌলাহাট মসজিদে ইমামতিও করেছে কিছু দিন। রুকুর যমজ বোন দিল আফরোজ ওরফে রোজিকে বিয়ে করে, সুখের সংসার হয়, রুকু ও মনিরুজ্জামানকে ঠকিয়ে শ্বশুরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে খুলনায় স্থানান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি শঠ, স্বার্থপর ও লোভী চরিত্র হিসেবে উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে।
মনিরুজ্জামান
বদিপিরের মেঝো ছেলে মনিরুজ্জামান প্রতিবন্ধী, অর্ধেক পশু অর্ধেক মানুষ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কোনো দৈবাৎ ঘটনায় হতো তার প্রতিবন্ধিতা অনেকাংশে কমে গিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্ত্রীর মন সে কখনো পায়নি। তবে রুকুকে সে নির্যাতন করেনি, বরং স্বমেহনে নিজের প্রবৃত্তি নিবারণ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
রফিকুজ্জামান
রফিকুজ্জামান ওরফে রফি মনিরুজ্জামান ও রুকুর একমাত্র ছেলে। কিন্তু এই চরিত্রের কোনো ভ‚মিকা উপন্যাসে নেই। রফিকুজ্জামানও বিপ্লবী ছিল এবং তার স্ত্রী জুলেখা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কচি ও খোকা নামে দুই ছেলেমেয়ে রেখে অকালে মারা গেল। রুকুর দুই নাতি-নাতনি নিয়ে বাকি জীবন পার করল। কচি আধুনিকা ও বিজ্ঞানমনস্কা। খোকা বিপ্লবী। কচির সঙ্গে দাদির সংলাপ উপন্যাসের অনেক পৃষ্ঠাজুড়ে এবং এই সংলাপের ভিত্তিতে উপন্যাসের অনেক কাহিনি বিবৃত হয়েছে। রুকু ও নাতনি কচির কয়েকটি অধ্যায়ের সংলাপে চেতনাপ্রবাহ রীতি অনুসৃত হয়েছে। উপন্যাসের চতুর্দশ অধ্যায় থেকে বৃদ্ধা রুকুর সঙ্গে নাতনি কচির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কথক হিসেবে তার অনুপ্রবেশ ঘটে। সংলাপগুলো কাহিনিকে অধিকতর জীবন্ত করে তুলেছে। দাদি-নাতনির সংলাপের ভিত্তিতে অনেক ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে।
দরিয়াবানু, দিল আফরোজ রোজী ও দিলরুখ রুকু
মৌলাহাট গ্রামের ধনাঢ্য প্রয়াত তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর স্ত্রী দরিয়াবানু বৈষয়িক এবং স্বামীর রেখে যাওয়া বিস্তর সহায়সম্পত্তির মালিক নিজেই সবকিছুর দেখভাল করতেন। সংসারের সিদ্ধান্ত তিনি একাই নিতেন- তার ওপর খবরদারির করার কেউ ছিল না। তাঁর সিদ্ধান্তেই যমজ কন্যা দিল আফরোজ রোজী ও দিলরুখ রুকুকে বদিপিরের দুই ছেলে নুরুজ্জামান ও প্রতিবন্ধী মনিরুজ্জামানের কাছে বিয়ে হলো। ওদের বিয়ের পর নুরুজ্জামান শ্বশুরের জমি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হলো। পাশাপাশি বাড়ি হওয়াতে সে অনেকটা ঘরজামাই হয়ে রোজীদের বাড়িতে থাকতে শুরু করল। মনিরুজ্জামানের কাছে রুকুকে বিয়ে দিয়ে তিনি সুখী হতে পারেননি এবং আত্মদগ্ধ হচ্ছিলেন। এই আক্ষেপ ও অনুতাপ থেকে মুক্তির জন্য তিনি ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যা করলেন।
সপ্রতিভ, বুদ্ধিমতী ও পরমা সুন্দরী দিলরুখ ওরফে রুকু সর্বংসহা নারী যে প্রতিবন্ধী স্বামীর ঘর করেছে বিনা বাক্য ব্যয়ে। তবে ঘর করলেও স্বামীকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি এবং দাম্পত্যজীবনে নিজে নিস্পৃহই থেকেছে যেন শরৎচন্দ্রের বিলাসীর মতো ফুলদানিতে রাখা বাসি ফুল। শফির প্রতি তার যে আকর্ষণ ছিল এবং মর্মে পীড়িত হতো তার বার্ধক্যে এসে সংলাপের মধ্য দিয়ে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। রুকু ছিল নির্মোহ ও নির্লোভ প্রকৃতির যে কারণে নুরুজ্জামান তাদের সম্পত্তি ভোগদখল করতে পেরেছিল। পক্ষান্তরে দিল আফরোজ ওরফে রোজি নিজে শঠতার আশ্রয় না নিলেও তার স্বামীর শঠতাকে বাধাও দেয়নি। তারা উভয়ই মৌলাহাট ছেড়ে এক সময় খুলনায় পাড়ি জমাল এবং উপনস্যাসের ক্যানভাস থেকেও বিদায় নিলো।
অন্যান্য চরিত্র
নবাব বাহাদুরের কাছারির দেওয়ান চৌধুরী আবদুল বারি ওরফে বারু মিয়া ও বড়ো গাজি চরিত্র দুটি এই উপন্যাসের তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্বে এই দুটি চরিত্রের আলোকপাত করা হয়েছে যদিও, তদুপরি এখানে আরও কিছু কথা তাদের প্রাপ্য মনে হচ্ছে। বারু মিয়া আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক সুশিক্ষিত এবং নিজ এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি হাতিঘোড়ায় চলাফেরা করতেন এবং তাঁর বন্দুক ছিল। বারু মিয়া কিংবা বড়ো গাজির সাংসারিক জীবনের কোনো উল্লেখ নেই উপন্যাসে। বড়ো গাজির সমকামিতার কেলেঙ্কারি ছিল যার সাক্ষ্য দিয়েছে খন্দকার হাসমতের ছেলে শফির বন্ধু রবিউদ্দিন। কিন্তু বারু মিয়া বিপ্লবী দেশপ্রেমিক ও মানবাবাদী রূপে চিত্রিত। তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী ছিলেন বারু মিয়ার বন্ধু এবং সেই হিসেবে রুকুদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। রুকুদের বাড়িতেই সপ্রতিভ শফিকে দেখে হরিণমারায় ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য পির সাহেবের কাছে আবদার করলে তিনি বারু মিয়ার আবদার ফেলতে পারেননি। বারু মিয়া শফিকে সেখানে ভর্তি করে দিয়ে হাসমতের বাড়িতে লজিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। শফি বারু মিয়ার চালচলন, শিক্ষাদীক্ষার বিভিন্ন আলোচনা, ঘোড়ায় চড়া এসব জমিদারি কাজকর্ম দেখে প্রভাবিত হয়ে তার পরম ভক্ত হয়ে পড়ল এবং তার মনে বারিচাচাজির একটি ইমেজ তৈরি করল। একজন মানুষ রূপে মা-বাবার চেয়েও বড়ো অভিভাবকের স্থান দখল করলেন বারু মিয়া। তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। শফিকে তিনি সুশিক্ষিত ও বিপ্লবী বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু শফি তাঁর অনুগত হয়ে শেষপর্যন্ত নিজের তৈরি পথেই হাঁটল। বাল্যবিবাহকে নিরুৎসাহিত করার জন্য এবং শফির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তিনি রুকুর সঙ্গে শফির বিয়ে হতে দেননি। এই ঘটনাটি ভালোর জন্য করলেও ফলাফল দাঁড়িয়েছে হিতে বিপরীত। শেষ বয়সে তিনি বহরমপুরের থিতু হয়ে ওকালতি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। আধুনিকমনস্ক শিক্ষিত সরকারি চাকুরে বড়ো গাজি বারু মিয়ার বন্ধু, তিনিও শফির মঙ্গল চেয়েছিলেন এবং লালবাগে নবাব বাহাদুরের ইনস্টিটিউটে ভর্তির জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। দুজনের পরামর্শে শফি লালবাগে এসেছিল। বড়ো গাজি শফির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক না হলেও তাঁর সিদ্ধান্তের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। তিনি শেষ বয়সে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।
ইকরাতুন একটি রহস্যময়ী নারী চরিত্র। ইকরাতুন বা ইকরা চরিত্রটির মাধ্যমে অলীক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে যা এই উপন্যাসের জন্য বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। একসময়ের ডাকাত আবদুলের স্ত্রী ইকরাতুন ছিল হিন্দু যার নাম ছিল করুণা। তার পারিবারিক ইতিহাস জানার সুযোগ করেননি লেখক। কীভাবে আবদুলের ঘরে এল তার বৃত্তান্ত উপন্যাসে নেই, ধরে নেওয়া যায় যেহেতু আবদুল ডাকাত ছিল তাই অপহরণ হতে পারে। লেখক কি এখানে অসত্যের পতন দেখিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ভাববাদের আশ্রয় নিয়েছেন? হয়তো হতে পারে, আবদুলকে কুষ্ঠ রোগী হিসেবে না-হয় কেন চিত্রিত করা হলো। ইকরাতুন ছিল ডাহিনি, সে অন্ধকার রাতে নগ্ন হয়ে মূর্তিপূজা করত এবং মানুষের চিকিৎসা করত। এটি ছিল তার সংসার চালানোর একটি পথ। স্তম্ভের কাছে, কিংবা শেওড়া গাছের নিচে তাকে নগ্ন হয়ে এলোচুলে নাচতে দেখেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ ছিল না। এজন্য বদিপির তাকে শাস্তিও দিয়েছিলেন। আবদুলের মৃত্যুর পর নুরপুরে গিয়ে সেখানে কারখানায় কাজ করতে শুরু করল। ঘটনাচক্রে বদিপির তাকে বিয়ে করলেন সৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু বদিপির যখন এত্তেকাফে থাকতেন তখন সে ডাহিনি হয়ে অর্থাৎ নগ্ন হয়ে আগের মতো কাজ করত। এই খবর পাওয়ার বদিপির তাকে তালাক দিলেন এবং পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে তাকে কতোল করার হুকুম দিলেন।
বহরমপুরের উকিল যামিনীবাবু স্বদেশী ছিলেন। তিনি স্টানলিকে হত্যা করতে এসে ব্যর্থ হলেন অর্থাৎ পিস্তলের ঘোড়া টানলে গুলি বের হয়নি, পরিণামে স্টানলির হাতে তাকে মরতে হয়েছিল। তার মেয়ে স্বাধীনবালা ও স্ত্রী সুনয়নী নুরপুরে দেবনারায়ণের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিল এবং এখানেই শফির সঙ্গে পরিচয় ওদের পরিচয় ঘটেছিল। স্বাধীনবালার শিক্ষাদীক্ষা চালচলন ও স্মার্টনেসের কারণে শফি কিছুটা টান অনুভব করলে সে পরোক্ষভাবে জানিয়ে দিলো যে সে লেজবিয়ান, শফির অগ্রসর হওয়ার সুযোগকে থামিয়ে দিলো। সাহসী ও স্বাধীনচেতা স্বাধীনবালা দেবনারায়ণের বাড়ি আশ্রয় নিয়েছিল স্টানলিকে হত্যার করার উদ্দেশ্যে। পরে এই কাজটি হরিনারায়ণ ও শফি করে দিলো তারই অনুপ্রেরণায়।
অলীক পুরুষ উপন্যাসে দেবনারায়ণ একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। দেবনারায়ণ রাজা রামমোহন রায়ের প্রচারিত ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে নিজ গ্রামে মন্দির স্থাপন করে যেখানে সব ধর্মের মানুষদের এক কাতারে আনার চেষ্টা চালালেন। কৃতকার্যও হলেন। এই গ্রামেই গড়ে তোলেন বিরাট লাইব্রেরি, কৃষিকাজের জন্য জমির বন্দোবস্ত নিলেন, বাঁধ দিলেন এবং মানুষের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করলেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানবতাবাদী মানুষ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। তিনি সরাসরি বিপ্লবী না হলেও মনে প্রাণে ইংরেজ বিতাড়নের জন্য অন্যদের সযোগিতা করতেন।
বাঁকিপুর পাঠশালার শিক্ষক পদ্ধতি গিয়াস উদ্দিন ও তাঁর কন্যা রেহেনা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেন দেবনারায়ণের বাড়ি এসে। গিয়াসউদ্দিনকে শফি দার্শনিক ডাকত। তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও হোমিও চিকিৎসকও। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা, শিক্ষাদীক্ষা ও জ্ঞানগরিমার কারণে শফি তার ভক্ত হয়ে গেল। তিনি রেহানাকে শফির কাছে বিয়ে দিতে চাইলে সে প্রত্যাখ্যান করল। শফিকে যে সময় বিয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সে সময় বিয়ের জন্য শফির মানসিক অবস্থাও ছিল না। বিদ্রোহী ও বিপ্লবীদের বিয়ে করার সময় কোথায়?
আয়মনি, রুকু ও রোজির আয়মনি খালা চরিত্রটি ছোটো হলেও উপন্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রুকুদের প্রতিবেশী দরিদ্র পরিবারের মেয়ে আয়মনি, প্রথম শফিকে বাড়ি এনে দুপুরে খাওয়া ব্যবস্থা করেছিল। দরিয়াবিবির সুখে-দুঃখে আয়মনি পাশে থাকত।
কৃষ্ণপুরের ব্রিটিশদের পা-চাটা জমিদার অনন্ত নারায়ণ ছিলেন লম্পট, তাঁর স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করলেও মুন্সিজি জানাল তাঁকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তাঁর কন্যা অত্যন্ত মেধাবী রত্মময়ী ছিল অসুস্থ। অনন্ত বাবুর ধারণা ছিল তাকে জিনে ধরেছে এবং বদিপিরের কাছে পাঠিয়েছিলেন জিন তাড়ানোর জন্য। কাজ হয়েছিল কিনা জানা যায়নি। তাঁর ছেলে পিতৃবিদ্রোহী হরিনারায়ণ ত্রিবেদী মনে করত রত্মময়ীর হিস্ট্রিয়া ছিল, জিন-ভূত কিছু না। রত্মময়ীকে মুন্সিজি পড়ালেখা করাতেন এবং তাকে জহুর আরা ডাকতেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে রত্মময়ী রক্ত দিয়ে খত লিখে পির সাহেবকে জানিয়েছিল শফির মৃত্যুর কথা। রক্ত দিয়ে লেখার মধ্য দিয়ে লেখক কি বোঝাতে চেয়েছেন যে, রত্মময়ীও শফিকে ভালোবাসত? অথবা বিপ্লবী হিসেবে অন্য বিপ্লবীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে শরীরের রক্ত দিয়ে খত বা চিঠি লিখেছিল। নাকি রক্তের হরফে লিখে একটি প্রতিভাময় তরুণের মৃত্যুর মুহূর্তে পিতার নিস্পৃহতাকে কটাক্ষ করেছিল।
উপরোল্লিখিত চরিত্রগুলো ছাড়াও আরও ছোটো ছোটো অনেক চরিত্র রয়েছে সেগুলো উপন্যাস নির্মাণশৈলীতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত সব চরিত্রকে উল্লেখ করলে পাতা ভারী হয়ে যাবে ভেবে তাদের বঞ্চিত করা হলো।
উপসংহার
মানব চরিত্রগুলো ছাড়াও এই উপন্যাসের কিছু অমানবীয়, অলীক বা অলৌকিক চরিত্র রয়েছে যেগুলোকে উল্লেখ না করলে উপন্যাসের পূর্ণতা পায় না। এই ধরনের অলৌকক চরিত্রগুলো মধ্যে সাদা জিন ও কালো জিন, পাথরের স্তম্ভ, বাদশাহি সড়ক, ময়ূরমুখো ছড়ি, পাথরের স্তম্ভের পিদিম, শেওড়াগাছ, খোঁড়াপিরের মাজার, পিরের সাঁকো, বৃক্ষÑ যে বৃক্ষ থেকে রক্ত ঝরত, শফির ঘোড়া পাহ্লোয়ান যে ঘোড়ার সঙ্গে শফি কথা বলত, ভেড়া যে ভেড়ার পালে ফেরেশতা আসে, বাঘ যে বাঘ মসজিদে এসে সেজদা দিয়ে চলে গেল, কালো সাপ যে সাপ গাছ থেকে নেমে লাশকে চুম্বন করল, নীল ঘোড়া ইত্যাদি। কিছু গ্রামের প্রচলিত প্রথা ও মিথের ব্যবহার লক্ষ করা যায় যেমন: প্রসবের পর ঝাল খেলে রোগ-ব্যাধি কমে যায় ও ব্যথা নাশ হয়, ইকরার বাহন বৃক্ষ, ইদের নামাজে জিন ইত্যাদি। কাল বা সময়ও এই উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে বিবেচ্য।
প্রথাগত ছকভাঙা স্বতন্ত্রধারার অনন্যসাধারণ ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে ‘মিথিক্যাল ম্যান’ নামে। বদিউজ্জামানের চরিত্রটি মিথিক্যাল হিসেবে সফল।
চরিত্রের বিন্যাসে ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের অনেক বাণী বা উদ্ধৃতি, দিন তারিখসহ ঐতিহাসিক তথ্য, পৃথিবীর বিখ্যাত কবিদের কবিতাংশ, বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রাসঙ্গি উদ্ধৃতি, রাজনৈতিক ঘটনাবলি, নিসর্গের বর্ণনা যে সব উপাদান উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে। কাহিনির বর্ণনায় বাংলা ভাষা প্রধান হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে মিশ্রণ রয়েছে হিন্দি, আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজি এবং রাঢ় বঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার শব্দ ও বাক্য। রাঢ় বঙ্গের লোকভাষার প্রাধান্য উপন্যাসটিকে উচ্চ মাত্রা দিয়েছে। শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপন্যাসের কাহিনি ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়নি। কথকের পরিবর্তনের ফলে উপন্যাসের ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এবং কাহিনিকেও জীবন্ত ও সরস মনে হয়েছে। রুকু ও কচির সংলাপগুলো অতীতের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে বৃদ্ধা রুকুর হাহাকার যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এই সংলাপগুলো যে ধরনের শিল্পভাবনা থেকে দিয়েছেন তা শ্রেষ্ঠ সংযোজন বলে প্রতীয়মাণ হয়। কেননা, যদি ধারাবাহিক আলোচনা হতো তাহলে এতটা প্রাণ পেত কিনা সন্দেহ থেকে যায়। এই উপন্যাসে রয়েছে ভাববাদ, বস্তুবাদ, অ্যাবসার্ডিটিজম, অস্থিত্ববাদ, দেশপ্রেম দর্শনের ভিত্তি। চেতনাপ্রবাহ রীতিও কোথাও কোথাও অনুসরণ করা হয়েছে। শোনা যায়, এই উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার মিশ্রণ রয়েছে। কিন্তু দাবিকে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই, বরং বলা যায় অলৌকিক কিংবা অলীক বিষয় এই উপন্যাসে রয়েছে যাকে জাদুবাস্তবতা বলার সুযোগ নেই। এটি অনন্যসাধারণ উপন্যাস, ধৈর্যশীল ও অগ্রসর পাঠককে সমৃদ্ধ করার মতো যথেষ্ট চিন্তার রসদ রয়েছে।