মোজাম্মেল হক নিয়োগী
মূলধারার সাহিত্যচর্চায় বাংলাদেশে যে কয়েকজন কথাসাহিত্যিক রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল হক অন্যতম সাহিত্যিক হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত ও সমাদৃত। তাঁর লেখার মধ্যে রয়েছে মাত্র আটটি উপন্যাস, তিনটি গল্পগ্রন্থ, একটি কিশোর উপন্যাস, প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ছয়টি। তাঁর অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর আরেকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর জীবনী পাঠ থেকে জানা যায়, তিনি হাইস্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই একটি ডিটেকটিভ ও দুটি প্রেমের উপন্যাস লিখেছিলেন। লেখক নিজেও ছিলেন প্রচন্ড আড্ডাবাজ ও বোহিমিয়ান স্বভাবের, যা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কিছু কিছু লেখায়। অত্যন্ত ক্ষুরধার প্রকৃতির এই লেখক ১৯৮৪ সালে লেখালেখি বন্ধ করে দিয়ে পাঠক ও লেখকদের হতবাক করে দেন।
কীর্তিমান লেখক মাহমুদুল হক ১৯৪১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে সিরাজুল ইসলাম ও মাহমুদা দম্পতির কোলস্পর্শ করেন। সিরাজুল ইসলাম সরকারি উচ্চ পদে চাকরিসূত্রে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যোগদান করেন এবং ১৯৫১ সালে পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকায় এনে আজিমপুর এলাকায় বসবাস শুরু করেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মাহমুদুল হক ছিলেন চতুর্থ। তিনি বারাসাতের কালীকৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে এ দেশে এসে ১৫৫২ সালে ঢাকার লালবাগের ওয়েস্ট এন্ড স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। রাতকানা রোগের কারণে কয়েক বছর লেখাপড়া বন্ধ থাকার পর ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয়) ভর্তি হলেও তুমুল আড্ডাবাজির কারণে লেখাপড়া আর হয়ে ওঠেনি। দৈনিক পত্রিকায় অনুবাদের কাজ দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। তিন মাসেই হাঁপিয়ে ওঠেন, এখানেও পোষাতে পারেননি। শুরু হলো মনিহারি দোকানদারি, তারপরে জুয়েলারি ব্যবসায়। মীজানুর রহমান ও প্রতাপউদ্দিনের সঙ্গে মিলে ‘গাঙচিল প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করে আবার নতুন ব্যবসায় নামেন, তা-ও টিকল না। তিনি ‘অগ্রগামী’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করতেন।
জীবন আমার বোন
মাহমুদুল হকের আটটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাসের মধ্যেই আটটিই বোদ্ধা পাঠকদের কাছে সমাদৃত। পৃথিবীর অনেক লেখকেরই লেখার পরিমাণ কম হলেও তাঁরা শ্রেষ্ঠ লেখকদের আসনে স্থান পেয়েছেন; ঠিক তেমনই মাহমুদুল হক অল্প লিখেও তাঁর লেখার বিষয়-আশয়, কলাকৈবল্য ও ভাষাশিল্পের গুণে শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকদের আসরে স্থান করে নিয়েছেন। সেরাদের যেমন সেরা হয়, ঠিক তেমনই মাহমুদুল হকের আটটি উপন্যাসের মধ্যেও দুটি সেরা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়; এগুলো অধিকতর পঠিত ও আলোচিত। এই দুটি উপন্যাস হলো ‘কালো বরফ’ ও ‘জীবন আমার বোন’। আমাদের জানামতে ‘জীবন আমার বোন’ এই আটটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও পঠিত এবং এই উপন্যাসের ওপর মোহাম্মদ শাকেরউল্লাহ সম্পাদিত বিশটি প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘জীবন আমার বোন, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থ বের হয়েছে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে।
দশটি অধ্যায়ের ১৫৮ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি ১৯৭৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের মাস, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সময়ের ব্যাপ্তিতে রচিত হলেও শেষ অধ্যায়ে স্বাধীনতা-উত্তর সামান্য আলোকচ্ছটা পড়ে। জীবন আমার বোন মার্চ মাসের সময়ের ব্যাপ্তিতে নির্মিত; স্মৃতিপ্রবাহে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহেদুল কবির খোকার অতীত জীবন সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়া যায়; যে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় কোনো এক বাসায় বাইশ বছর বয়সী কলেজপড়–য়া তার ছোট বোন রঞ্জুকে নিয়ে বসবাস করে। দুই বছর আগে মা মারা গেছে এবং বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পাকিস্তানে কর্মরত। ধানমন্ডির একটি বাড়িতে নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাট সংসারে দুই ভাইবোনের নিগূঢ় ভালোবাসার বন্ধনে তাদের জীবনের চালচিত্র সামান্য ফুটে উঠলেও তাদের পারিবারিক জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠেনি। বাসায় কাজের মেয়ে ময়না, খন্ডকালীন মালী হাতেম আলীসহ উপন্যাসে বিশটির কিছু বেশি চরিত্রের মধ্যে খোকার একক আধিপত্যই সমস্ত উপন্যাসজুড়ে লক্ষ করা যায়। সাধারণত কেন্দ্রীয় চরিত্র বা প্রোটাগনিস্টের ক্ষেত্রে যা ঘটে অর্থাৎ উপন্যাসের নায়ককে যেভাবে দেখা যায়, সেভাবেই চিত্রিত হয়েছে খোকা। খোকার তিন বোনের দুই বোন শৈশবে পুকুরে ডুবে মারা যায় এবং জীবিত রঞ্জুকে নিয়ে পারিবারিক জীবনের দৃঢ় বন্ধন। খোকাকে চিত্রিত করা হয়েছে বোহিমিয়ান, জুয়াড়ি, লম্পট, সমাজ-সংসার ও দেশের প্রতি নিস্পৃহ হিসেবে। রাজীবের দ্বিতীয় স্ত্রী নীলা অর্থাৎ খোকার নীলা ভাবির সঙ্গে খোকার পরকীয়ায় টালমাটাল বর্ণনা উপন্যাসের ক্যানভাসে উজ্জ্বল। স্ত্রীর প্রতি নিরাসক্ত রাজীবের ও রাজীবের প্রথম স্ত্রী সিদ্দিকা ভাবির হয়তো এই পরকীয়ার ক্ষেত্রে পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে, তার বাসায় খোকার অবাধে যাওয়া-আসা এবং খোকাকে সাগ্রহে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তাই প্রমাণিত হয়। রাজীব খোকার বন্ধু। দুজনের অসম বয়সের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার দুর্বল ভিত্তির মাঝে নীলা ভাবির ভাবাবেগের আকর্ষণীয় টান সম্পর্ককে নিবিড় করেছে।
অ্যান্টিক্লাইমেক্সের এই উপন্যাসে অ্যান্টিহিরো খোকাকে কেন্দ্র করে আখ্যানের গতিপ্রবাহে দুটি ধারা সুস্পষ্ট। একটি খোকার ব্যক্তিগত নীলা ভাবির সঙ্গে প্রেমময় বর্ণময় লীলাখেলা ও পারিবারিক জীবনপ্রবাহ এবং অন্যটি দেশের রাজনৈতিক উন্মাতাল প্রবাহ। একাত্তর সালের রাজনৈতিক উন্মাতাল প্রবাহে খোকা নিস্পৃহ ও নেতিবাচক চরিত্র; এই প্রবাহে আদর্শিক ও দেশপ্রেমের দিক থেকে মুরাদ ইয়াসিন ও রহমান সক্রিয়, উজ্জ্বল। একাত্তরের মার্চ মাসের সময়সীমায় রচিত, ক্র্যাকডাউন, রহমানের মৃত্যু, ইয়াসিন পঙ্গু, কমান্ডার হিসেবে মুরাদের খ্যাতির হালকা বর্ণনার কারণে এটি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে মান্য করা হচ্ছে। প্রচলিত ধারায় বা কাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্রে হিরোইজম, যুদ্ধের বর্ণনা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, আদর্শিক বিষয় পাঠকসমাজ প্রত্যাশা করে। কিন্তু এই উপন্যাসে এই ধারা ও কাঠামো ভাঙা হয়েছে। বদলিসূত্রে পাকিস্তানে চাকরিরত ঘুষখোর (মুরাদের ভাষায়) সরকারি চাকুরের বখে যাওয়া ছেলে খোকা-নারী, মদ, সিগারেট, আড্ডাবাজি, গুলতাপ্পি নিয়ে যার জীবন-বাবার রোজগারের টাকা ভাঙিয়ে দুই ভাইবোন ধানমন্ডির মতো জায়গায় বিলাসী জীবনযাপন অভ্যস্ত। পাশ থেকে মধ্যবিত্ত ঘরের অভাবী মুরাদ দেশপ্রেম, বীরত্ব ও আদর্শিক বলয়ে হিরো হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাসে নীলা ভাবি ও খোকার প্রেম, তরুণদের মিথস্ক্রিয়া, আড্ডাবাজি ইত্যাদির কাছে রাজনৈতিক প্রবাহটি প্রাবল্য হারায়, যদিও সেই সময়ে তরুণসমাজের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুব বেশি ছিল ইতিহাস থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। একাত্তরের আগুনঝরা দিনগুলোতে সুবিধাবাদী উচ্চবিত্ত ছিল নিরাসক্ত ও মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। এ দিক থেকে তখনকার বাস্তবতার এক নিটোল প্রতিচিত্র ‘জীবন আমার বোন’ উপন্যাস। লেখকের বর্ণনায় রাজনীতির একটি চিত্র যেখানে খোকাকে আউট অব ফোকাস দেখা যায়:
[…] জাহাজ বোঝাই সৈন্য চট্টগ্রামের দিকে ছুটে আসছে, বেলুচিস্তানে ঈদের জামাতের ওপর বোমা দাগানো কসাই টিক্কা খান আসছে নতুন লাট-বাহাদুর হয়ে; দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, ছবি, তবু এসবের কোনো গুরুত্ব খোকার কাছে নেই। রাজনীতির ব্যাপারটাই আগাপাস্তলা একটা জমকালো ছেনালি; একজন শিক্ষিত নাগরিকের দায়িত্ব সম্পর্কে তার পুরোপুরি ধারণা থাকলেও ভোটার লিস্টে সে তার নাম তোলেনি। রাজনীতির ব্যাপার তার কাছে শিকার ফসকাতে না দেওয়া হুবহু নেই মাদামোয়াজেল ব্লাশের মতো। [জীবন আমার বোন, পৃ. ১৪]
সারা দেশের মানুষ যখন মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে আগুনমুখো, দাবি আদায় ও স্বাধীনতার জন্য মরিয়া, মিছিলে মিছিলে রাজপথ কম্পিত, তখন খোকা রাজনীতিকে ছেনালিপনা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। আবার তার মুখেই শোনা যায় নারীর শরীরের স্থুল ও রগরগে রসাল বর্ণনা। সেই সময়কার দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ও জনগণের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় খোকার বন্ধু রহমান, ইয়াসিম ও মুরাদের মাধ্যমে। একাত্তরের রাজনৈতিক উত্তাপ খোকা কিংবা নীলা ভাবির গায়ে লাগেনি। তারা বরং চুটিয়ে প্রেম করে জীবনকে রংধনুর মতো রঙিন করে তুলতে ব্যস্ত। খোকা বিলীন হয়ে যায় নীলা ভাবির প্রেমের সরোবরে। তাদের কামান্ধপ্রেম ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগিয়ে গেলেও প্রেমের প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা ছিল না, ছিল কেবল লালসা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়। লেখকের ভাষায়-
[…] পৃথিবীর সকল নীলাভাবীরাই এক একটি জ¦লন্ত কামকুন্ডূ, ফুটন্ত টগবগে আগ্নেয়গিরি, যার নিদারুণ লাভাস্রোতে পীত ধবল কালো বাদামি রাশি রাশি খোকার দগ্ধাবশেষ গড়ান খেয়ে চলে। [তদেব, পৃ. ২১]
একইভাবে রাজীবের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে হয়তো স্বামীর প্রেমের কিংবা শারীরিক শীতল বন্ধনের কারণেই খোকার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। না-হয় কেন নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দিতে চায়-
খোকা, তুমি জানো না বা জানো, আজ মুখ ফুটে একটা কথা তোমার কাছে অকপটে স্বীকার করবো, সত্যিই আমি তোমাকে ভালোবাসি-। […] নিজেকে অবিশ্বাসিনী স্ত্রী ভাবতেও ঘৃণা হয় আমার। পরস্পরকে ভালোবেসেই আমরা বিয়ে করেছিলাম, এখনো ভাবতে পারি না তাতে চিড় খেয়েছে। তোমাকে নিয়ে এইভাবে আমি অনেক ভাবলাম। [তদেব, পৃ. ২৯-৩০]
নীলা ভাবির প্রেমের পালে যেন মাতাল হাওয়া লেগেছে। সেই হাওয়ায় ভেসে যেতে নিজে ভাসিয়ে নিতে চায় খোকাকে। মাঝে মাঝে দুজনের মধ্যে মান-অভিমান চলে। কিন্তু খোকা তখন নিস্পৃহ নিরুত্তাপ থাকে। বরং নীলা ভাবিকেই দেখা যায় প্রেমিককে পাওয়ার জন্য ফুসলানোর জন্য কথার জাল পাতে।
[…] ইচ্ছে করলেই আমি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারি তোমাকে, ডুবিয়ে দিতে পারি কাদায়; আমি চাই সানন্দে তুমি আমার ক্রীতদাস হবে। তোমাকে ঘুঙুরের মতো পায়ে বেঁধে রাজ্যময় বেড়াতে পারি এখনো। ও যেমন বেঁচে আছে, আমিও মরি নি, বেঁচে আছি আমিও। কি নির্লজ্জ সে উল্লাস, তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারবো না। [তদেব, পৃ. ৩৮-৩৯]
খোকা শুধু সংসারজীবনেই উদাসীন হয়, দেশের পরিস্থিতি থেকেও নিজেকে মুক্ত রাখে। কোনো কিছুতেই সে সরাসরি জড়াতে চায় না; বরং তার কথায় দেশের রাজনীতি কিংবা স্বাধীনতার প্রতি অবজ্ঞাসূচক কথাবার্তা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে খোকা নয়, মুরাদ প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনীতির মাঠে, মিছিলে এবং পরিশেষে রণক্ষেত্রে।
রেসকোর্সের মিটিংয়ের কথা বলছিস?
হ্যাঁ। সবাই কানাঘুষা করছে কালকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে। বেশ লাগছে যাই বলিস। জীবনে এই রকমেই উত্তেজনা চাই। স্বাধীনতা-টাধিনতা বুঝি না, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি দেশটা একটা বৈপ্লবিক পরিণতির দিকে লেজ তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে। [তদেব, পৃ. ৫০]
কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের অন্তর্দৃষ্টি শাণিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি তখনকার তরুণসমাজের শুধু বাহ্যিক দিকই দেখেননি, তিনি দেখতে পেয়েছেন তাদের অন্তর্জগৎ, শুনতে পেয়েছেন তাদের মুখের ভাষা। তরুণরা কোনো নারীকে কীভাবে দেখে, কী কথায় রহস্যময়তার জাল বোনে, তা তিনি নিটোল ভাষায় এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে, তা যেন তরুণদেরই মুখের কথা। এই উপন্যাসে যেমন নির্দিষ্ট জোরালো প্লট নেই, ঠিক তেমনই নেই প্রচলিত ভাষার কাঠামো। তিনি এসব ভেঙে নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন। তিনি তরুণদের মুখের কথাকে যেন শুনতে পেয়েছেন। এ কারণে এই উপন্যাস ইউনিক এবং ভিন্ন মাত্রার মর্যাদা পেয়েছে। একটি নমুনা দেখা যাক-
[…] মুরাদ নিজেও খুব ভালো করে জানে, রেক্সে বসে গুলতানি মারার সময় বন্ধুরা প্রায় সবাই তার বোন লুলু চৌধুরীকে নিয়ে কদর্যভাবে ইয়ার্কি-ঠাট্টা করে, কেবল খোকা এই দলের বাইরে। লুলু চৌধুরীর নদগড়ে পাছা দুলিয়ে হাঁটা, ঢুলঢুলে চাহনি আর ফিক করে হাসা দিয়ে গোটা আদমজি জুট মিলটাই কেনা যায়, সেদিন স্বপ্ন দেখলাম ন্যাংটো হয়ে ঘোড়ায় চেপে সারা ঢাকা শহর টহল দিচ্ছে লুলু চৌধুরী, সাক্ষাৎ লেডিগোদিভা, লুলু চৌধুরীর শাড়ি পরার স্টাইলটা মারাত্মক, মনে হয় আর দেড় সেকেন্ডের গা থেকে সব আবরণ ঝরঝর করে খুলে পড়ে যাবে, হামেশাই মওলা রহমান নূরুদ্দিনদের মুখ থেকে এইসব মন্তব্য শোনা যায়। [তদেব, পৃ. ৭৫]
পূর্বেই বলা হয়েছে, খোকা রাজনীতি প্রভাবমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার যে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য উপন্যাসে যেমন- পাকিস্তানের দালাল, মুসলিম লীগার, রাজাকার, শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামস বাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়, সে ধরনের বিরোধিতাকারী কোনো অ্যান্টিপ্রোটাগনিস্ট নেই এই উপন্যাসে। অবশ্যই যে সময়ের ব্যাপ্তিতে উপন্যাসের কাহিনি ধারণ করা হয়েছে সে সময়ের মধ্যে স্বাধীনতা বিরোধীদের থাকার কথা নয়। তবে খোকা চূড়ান্তভাবে দূরে দাঁড়িয়ে একজন দর্শক হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং আন্দোলনের প্রতি নেতিবাচক মন্তব্য করে গেছে। এসব তার পছন্দ হয়নি। কেন? বাবা সরকারি চাকুরে বলে? একটি টগবগে যুবকের কেন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি কোনো টান থাকবে না? কেন দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দরদ থাকবে না? এর সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকলেও বোঝা যায় যে, তিনি চরিত্রটি এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। বড়লোকের ছেলেপুলেরা যে দেশের কোনো বিষয়ে মাথা ঘামায় না তা-ই হয়তো লেখক প্রকাশ করেছেন। একই কারণে প্রশ্ন জাগে যে, খোকার কাজ ছিল? তার কাজই কি ছিল কেবল নারী আর মদের পেছনে ছুটে বেড়ানো? তার শিক্ষা-দীক্ষা-পেশা বিষয়-আশয় লেখক কেন আড়াল করে রেখেছেন।
উপন্যাসে ৭ই মার্চের কথা উল্লেখ আছে, ‘বঙ্গবন্ধু’ও উল্লেখ আছে, তবে খোকা যেন ফ্রেমের বাইরে, বৃত্তের বাইরে যে এতটাই বাইরে যে, ভোট দিতে হবে বলে ভোটার লিস্টে নিজের নামও লেখায়নি। লেখকের বর্ণনায় নেতাজি বোসের ভাষণের কথা, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কথা এমনকি কবি নির্মলেন্দু গুণের কাব্যগ্রন্থের নামেরও অবজ্ঞার সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে-
[…] সিল্কের কাপড়ের উপরে ফরফর করে উড়ছে- ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’ নিদারুণ চিত্ত-চাঞ্চল্যে ভিতরের নিস্তরঙ্গ হ্রদ ঘুলিয়ে উঠলো খোকার। সারা দেশ চামুন্ডার মতো রক্তলোলুপ জিভ বের করে রেখেছে, রক্ত দাও, রক্ত দাও, আর রক্ত দাও। কবিতার একটি বই বেরিয়েছে কয়েক মাস আগে, তারও নাম, ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, জোর করে দেওয়া নাম। রেসকোর্সের মিটিং-এর যে ভাষণ, সেখানেও ওই একই কথা, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব’- [তদেব, পৃ. ৭৭]
খোকা কামুক প্রেমিক, তার মন ও মননে নারীর শরীরই আধিপত্য বিস্তার করে আছে। এমন পুরুষের কাছে দেশপ্রেম কিংবা একাত্তরের উত্তাল দিনে নিরুত্তাপ থাকাটা স্বাভাবিক। সে উত্তপ্ত হয় নীলা ভাবির কাছে, নিজেকে সমর্পণ করে ও বিলীন হয়ে যায় কামরসে:
[…] একে যোনি, দুয়ে স্তন, তিনে দংশন, চারে বন্ধন,-গোলাপের কাঁটার চেয়েও বেশি নখ সেই থামায়। শেষে সরোবর ভেঙে ডোম্বী মৃণাল খায়, ডোম্বী তোমাকে আমি মারবো বলে রুরুরুরু খোকাকাহ্নপাদ বিড়ালের পিঠে সওয়ার হলাম। আমি জানি না কে আমাকে বারুণী দিলো, আমি জানি না কে আমাকে ডমরু শোনালো, আমি মদকলকরী খোকাকাহ্নপাদ বিড়ালের পিঠে সওয়ার হলাম। আমি জানি না কে আমাকে বারুণী দিলো, আমি জানি না কে আমাকে ডমরু শোনালো, আমি মদকলকরী, খোকাকাহ্নপাদ প্রবেশ করলাম নলিনীবনে রুরুরুরু রুরুরুরুরুরুরুরু। [তদেব, পৃ. ৮১]
তবে খোকাকে একপেশে কামুক হিসেবেই চিত্রিত করেননি কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক। অ্যাবসলিউট বলে দুনিয়াতে যেমন কিছু নেই, তেমনই খোকাও নির্ভেজাল লম্পট পুরুষ নয়। তার মধ্যেও অনুতাপের দহন আছে, আছে আত্ম-সমালোচনা করার শক্তি। এখানে খোকাকে কিছুটা মহৎ হিসেবে নির্মাণ করেছেন কথাসাহিত্যিক:
[…] আমি একটা লোচ্চা, তার এইসব মনে হয়েছে,-আমার কোনো বাছবিচার নেই, আমি একটা লম্পট, কামুক; আজ আমি নীলাভাবীকে বিছানায় কাত করেছি, সবে শুরু আমার, হয়তো কালই আবার হন্যে হয়ে উঠবো, আবার কাউকে চিত করবো। পরপর কয়েকটা দিন এইভাবে সে নিজের মনের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ করেছে। ভিতরের গরল ভুর ভুর করে গেঁজে উঠেছে। পরিত্রাণ চাই! পরিত্রাণ! পাগলের মতো বেরিয়েছে ঘর থেকে, মুরাদকে চাই, সারা শহর খুঁড়ে বের করতে হবে মুরাদকে; শেষ পর্যন্ত সালামারে নিয়ে গিয়েছিল মুরাদ, এপ্রিলের একটি আস্ত রাত বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছিলো। সেই একবারই তার মনে হয়েছিল মদ কি কুচ্ছিত জিনিশ; অস্থিরতার দাপটে চ‚ড়ান্তভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল সে। [তদেব, পৃ. ৮২]
দেড় শ পৃষ্ঠার উপন্যাসে ছাড়া ছাড়া অনেক বিষয়ই স্থান পেয়েছে। যেমন- রঞ্জুর প্রতি মুরাদের মানসিক টানের কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এই টান যেন বিন্দুতেই নিঃশেষ হয়ে যায়; পরিণতির দিকে এগোয় না। হয়তো হতে পারত আরেকটি প্রেমকাহিনি, রঞ্জুর মৃত্যুর পর ঘটতে পারত আরেকটা ট্র্যাজেডি। কিন্তু সচেতন লেখক বলেই হয়তো তিনি মানুষের ভাবজগতে যে এমন ঘটনা ঘটে, তাই পরিণতির দিকে নিয়ে যাননি।
নীলা ও খোকার প্রেমের পরিণতিও অসমাপ্ত। নীলা জীবনের সর্বস্ব দিয়ে খোকাকে চেয়েছে, কিন্তু খোকা সাড়া দেয়নি; ফলে বেপরোয়া নীলা খোকাকে থাপ্পড় দিয়ে তাদের বিচ্ছেদের রেখা টানে।
পঁচিশে মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে রাজীবের মুখে মর্টার শেলের আঘাত লেগে সে মৃত্যুবরণ করে, মুখটা বিকৃত হয়ে যায়। লাশের সঙ্গে দুই দিন থাকার পর নিজের বোন রঞ্জুর খোঁজে বাসায় ফেরে। সে রাতে রঞ্জুও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। পরে তারা ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় রঞ্জু জ্বরে আক্রান্ত হয়। রঞ্জু কীভাবে মৃত্যুবরণ করল, খোকাও ভেবে পায় না। রঞ্জু এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মানুষের পায়ের তলায় পড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে মারা গেছে কি না সে কথা খোকাও জানে না। রঞ্জুর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই উপন্যাসের পরিণতি ঘটে। বোনই তাঁর জীবন ছিল, কিন্তু তাকেও হারাতে হয়েছে- এই মর্মপীড়ায় আক্রান্ত হয় খোকা। কিন্তু লেখক শেষে আরেকটি অধ্যায় যুক্ত করে উপসংহারের বাতাবরণে উল্লেখ করেছেন যে খোকার বন্ধু রহমান, ইয়াসিন ও মুরাদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা। রহমান মৃত্যুবরণ করে, ইয়াসিন পঙ্গু হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে মুরাদ খ্যাতি অর্জন করে।
মাহমুদুল হকের ভাষা চমৎকার ও আকর্ষণীয়। উপমা, উপমেয়র ছড়াছড়ি। হ্রস্ব, নাতিদীর্ঘ ও দীর্ঘ বাক্যের ন্যারেশন। এখানেই চমৎকারিত্ব। বেশ কিছু বিশ্ব ক্ল্যাসিক উপন্যাসের নাম উল্লেখ করেছে উপন্যাসে। চরিত্রকে শক্তিশালী করার জন্য, বিশ্বস্ত ও বাস্তবতার মোড়ক দেওয়ার জন্য চরিত্রের পাঠাভ্যাসের বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে অবশ্য লেখকের পড়াশোনা ও ক্লাসিক সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিতিও উদঘাটিত হয়। রশীক করীমের উপন্যাসে এ ধরনের কিছু ক্লাসিকের নাম পাওয়া যায়। ধূর্জটিপ্রসাদের ‘অন্তঃশীলা’ উপন্যাস ক্লাসিকের নাম উল্লেখ থাকাতে প্রোটাগনিস্ট খগেন্দ্রের প্রখর মেধা ও পড়াশোনার পরিধি সম্পর্কে পাঠক নিশ্চিত হতে পারে। এই উপন্যাসেও খোকাকে এস্টাব্লিস্ট করার জন্য লেখক এই কৌশল গ্রহণ করেছেন।
ভাষার দক্ষতা ও প্রয়োগ, সৌন্দর্য ও চমৎকারিত্ব মাহমুদুল হকের কথাসাহিত্যের প্রধান আকর্ষণ। সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁর সাহিত্য খুব বেশি মর্যাদা না পেলেও বাংলা সাহিত্যের বোদ্ধা শ্রেণির পাঠকের কাছে তিনি গুণী লেখক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষাকে সাবলীলভাবে জুড়ে দিয়েছেন, ভাবেননি ব্যাকরণ, ভাবেননি প্রমিত কি না। এ-কারণেই তাঁর লেখা ভিন্ন, গতিশীল ও চৌকস। তিনি সরল, জটিল ও যৌগিক বাক্য নির্মাণে বিদগ্ধ, নিঃসন্দেহ। এই উপন্যাসে কয়েকটি দীর্ঘ বাক্য রয়েছে; উদাহরণস্বরূপ, দুটি দীর্ঘ বাক্য-
[…] এই ঔদাসীন্যে…তার পাখায়- [তদেব, পৃ. ১৩০] এবং […] তার অসহায়তার…আবা আবা- [তদেব, পৃ. ১৩১]।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে অনেক উপন্যাস রচিত হয়েছে। প্রখ্যাত লেখকদের কয়েকটি করে উপন্যাস পাওয়া যায়। জীবন আমার বোন উপন্যাসকেও মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়; যেমনটি কালো বরফকে বিবেচনা করা হয় দেশভাগের উপন্যাস হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে আলোচিত উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের উপাদান অনুসন্ধান করাটা স্বাভাবিক। আবার যদি এটি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে মান্য না করা হয়, তাহলে এটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সামাজিক উপন্যাস হিসেবেও মান্য করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের উপাদান খুঁজলে, প্রাক্-মুক্তিযুদ্ধের নবম অধ্যায় এবং যুদ্ধপরবর্তী দশম বা শেষ অধ্যায় ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের উপাদান নেই। মার্চ মাসের সময়সীমায় উপন্যাস রচিত হলেও অষ্টম অধ্যায় পর্যন্ত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মুখ্য ধারায় এবং রাজনৈতিক উপাদান গৌণ ধারায় চিত্রিত হয়েছে। এই লেখকের ‘খেলাঘর’ ১৯৭৮ সালে রচিত, গ্রন্থাকারে ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের পটভ‚মিতে অধিকতর মুক্তিযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট। ‘খেলাঘর’ উপন্যাসে পরোক্ষভাবে যুদ্ধের বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেদনাকাতর ঘটনাটি লেখক চিত্রিত করেছেন পঁচিশে মার্চের রাতে ধর্ষিত রেহানার মনোবৈকল্যের চরিত্রটি চিত্রিত করে। সম্পূর্ণ উপন্যাসজুড়েই বিষাদের স্রোত বিমূর্ত প্রবাহে বয়ে যায়। ফিকশন হিসেবে এর চমৎকারিত্ব রয়েছে যে, রেহানা ট্রমাটাইজড ও সাইকিক এবং নিরাপত্তার জন্য তাকে দূরে কোনো এক গ্রামের ভেতরে রেহানার বড় ভাইয়ের এক বন্ধু, কলেজশিক্ষক ইয়াকুবের কাছে পাঠানো হয়। ইয়াকুবের বন্ধু মুকুল স্কুলশিক্ষক, যে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহযোগিতা করে কিন্তু ইয়াকুবের যুদ্ধের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যেমনটি দেখা যায় খোকার ক্ষেত্রে। প্রধান চরিত্রকে কেন যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে বীরত্বের মুকুট পরাননি তা পাঠকের মনে প্রশ্ন থাকলে থাকতেও পারে।