মোজাম্মেল হক নিয়োগী
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একজন বিরল প্রতিভার ‘গল্প বলিয়ে’, তা বলা বাহুল্য। জনপ্রিয়তার মানদন্ডে হুমায়ূন আহমেদ আরেক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও ছাড়িয়ে গেছেন বলে অনেকে মনে করেন বা বলেনও। বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তার কাছাকাছি ইমদাদুল হক মিলনকে অনেককে বলতে শোনা যায়। অস্বীকার্য যে, জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি আছে কি না আমাদের জানা নেই। সবই অনুমান নির্ভর, বই বিক্রির সংখ্যা থেকে বলা হয়ে থাকে। বিষয়টি অন্যভাবে দেখলে দাঁড়ায় যে, জনপ্রিয়তার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ কেউ আছেন বলে মনে হয় না যদিও তাকে জনপ্রিয় হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় না।
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোনা মহকুমার মোহনগঞ্জে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বর্তমানে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। পিতা শহিদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মাতা আয়েশা ফয়েজ। তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার উপবিভাগীয় পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহিদ হন। তাঁর গোটা পরিবারের সবাই শিল্পসাহিত্যানুরাগী এবং পারিবারিক পরিমন্ডলে ছিল বইপড়া ও সাহিত্যের আবহ। তাঁর ছয় ভাই-বোন। তিন ভাই বাংলাদেশে খ্যাতির শীর্ষে। তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক এবং আহসান হাবীব কার্টুনিস্ট ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে সমধিক পরিচিত।
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৫৫ সালে সিলেটের কিশোরী মোহন পাঠশালায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ১৯৬৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থাতেই তিনি তাঁর আলোচিত ও বহুল পঠিত ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি লেখেন। তারপর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পূর্ণ সময় লেখালেখিতে মনোযোগ দেন।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ কেবল কথাসাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নন, তিনি চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকের কাহিনিকার ও নির্মাতা হিসেবেও সমধিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। মোদ্দাকথা, বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একটি ইতিহাসের নাম। তাঁর লেখার মূল উপজীব্য দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতি। কিন্তু তাই বলে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। উপন্যাসে বা গল্পে নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনাচারও তাঁর কথাসাহিত্যে যথেষ্ট পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়।
জানা মতে, তিনি নয়টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস লেখেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্যানভাসে ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ আধা ডকুমেন্টারি পরিপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে বাংলাদেশে বহুল পঠিত ও আলোচিত। বলা বাহুল্য, এই লেখকের সব উপন্যাসই পাঠকনন্দিত; তদুপরি, সেরাদের যেমন সেরা আছে, ঠিক তেমনই পাঠপ্রিয় উপন্যাসেরও সেরা আছে। এদিক থেকে অনুমান করা যায় ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ সবচেয়ে বেশি পঠিত ও আলোচিত। ‘আগুনের পরশমণি’ এবং ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসিকা অবলম্বনে তাঁর নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দুটিও মানুষের হৃদয়ের কড়া নাড়ে। তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলো হলো : ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নির্বাসন’, ‘সৌরভ’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘১৯৭১’, ‘সূর্যের দিন’, অনিল বাগচীর একদিন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ ও ‘দেয়াল’।
শ্যামল ছায়া
শ্যামল ছায়া, নির্বাসন ও সৌরভ যথাক্রমে প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ ও ১৯৭৮ সালে। প্রায় চল্লিশ পৃষ্ঠার ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসিকার মর্যাদা পাওয়া সমীচীন বলে প্রতীয়মান হয়। প্রচলিত উপন্যাসের ফরমেট ভেঙে এবং হুমায়ূন আহমেদ যে ফরমেটে লেখেন সেভাবে লেখা হয়নি ‘শ্যামল ছায়া’। আবু জাফর শামসুদ্দিন, হুমায়ূন আহমেদ, হাসান আলি, আবদুল মজিদ, আনিস সাবেত- এই পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার দলটি রামদিয়া ঘাটে রওনা হয়েছে; সেখান থেকে মেথিকান্দা যাবে। মেথিকান্দা ব্রিজটিকে বলা হয় মুক্তিবাহিনীর ‘মৃত্যুক‚প’। কারণ, এর আগে আরও চারবার হামলা করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়েছেন কিন্তু ব্রিজটি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যেকেই একটি করে অধ্যায়ের কথক উত্তম পুরুষ এবং তাদের কথায় তখনকার যুদ্ধ পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। পাঁচজনের বর্ণনায় পাঁচটি অধ্যায় শেষ হয়ে ষষ্ঠ অধ্যায়টির কথক নাম পুুরুষ। মোট ছয়টি অধ্যায়ে এই ‘শ্যামল ছায়া’ শেষ হয়। গল্পটি সরল। পাঁচজনের একটি দল বর্ষাকালে রাতের অন্ধকারে নৌকায় যাচ্ছে। দূরের যাত্রা। এই যাত্রাপথেই কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে আখ্যান শেষ হয়। এই পাঁচজনের কাউকে আর যুদ্ধ করতে হয়নি। অন্য দলের যোদ্ধারা মেথিকান্দা ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়।
প্রথম অধ্যায়ের কথক মুক্তিযোদ্ধা আবু জাফর শামসুদ্দিন। এই অধ্যায়েই সবার ব্যক্তিগত আচার-আচরণ চিত্রিত হয়। নৌকার মাঝি হাসান আলি। সে একরোখা এবং কারও কোনো কথার সহজে উত্তর দেয় না। মন চাইলে দেয়, না-হয় চুপ থাকে। কথকের ভাষায় অত্যন্ত বিরক্তিকর এক মানুষ, যাকে নিয়ে চলাফেরা কঠিন। কিন্তু সে দৈত্যের মতো। নৌকা চালাতে পারে যতক্ষণ চালানো দরকার। বৃষ্টিভেজা রাতে ওরা চলছে। পথে পথে রাজাকারের উপদ্রব। মশার কামড়ে নৌকায় ওরা ঘুমাতে পারে না। পথে কাসুন্দিয়ার হরি পালের সদস্যদের সঙ্গে দেখা। ওরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কারও দেখা হলে মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হতো, তার বর্ণনায় হরি পালের পরিবারের সদস্য এবং পঞ্চম অধ্যায়ে মোক্তার সাহেবের পরিবারের সদস্যদের আচরণের মধ্য দিয়ে বর্ণনা করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেখার জন্য তখন মানুষ উদগ্রীব হয়ে থাকত, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারা কিংবা কাছে যাওয়া ছিল অনেকটা গর্বের, আনন্দের। সমাজ বাস্তবতার এই দৃশ্য হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ ছায়াছবিতেও লক্ষ করা যায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য ওই বাসার তরুণীর আকুলতা। প্রথম অধ্যায়ে পূর্বের যুদ্ধের ও প্রশিক্ষণের দু-তিনটি স্মৃতিচারণের এবং চা-পানের বর্ণনা পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের কথক হুমায়ূন আহমেদ, দুর্বল চিত্তের মানুষ হলেও মেথিকান্দা ব্রিজ গুঁড়িয়ে দেওয়ার দলের কমান্ডার। এই অধ্যায়েও হুমায়ূনের পরিবারের মির্জাপুর পালিয়ে যাওয়ার স্মৃতিমন্থন করা হয় এবং ছোট একটি মেয়ে পরীর মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। স্মৃতিমন্থনে রাজাকার হাজি সাহেবের মৃত্যুদন্ডের হাস্যরসাত্মক বর্ণনা, মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু বীরত্ব উঠে আসে।
তৃতীয় অধ্যায়ের কথক হাসান আলি। হাসান আলির চরিত্রটি কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। সে গরিব মানুষ, কামলা-মজুরি খেটে জীবিকা নির্বাহ করত। চেয়ারম্যানের কথায় সত্তর টাকা মাইনেতে সে রাজাকারের চাকরি নিয়েছিল। কিন্তু নিরপরাধ, বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর অকথ্য নির্যাতন, শরাফতের নিরপরাধ বিএ পাস ছেলে ও কবিরাজের মেয়ের হত্যাকান্ড দেখে সে দারুণভাবে অনুতপ্ত ও মর্মাহত হয়, সে মেনে নিতে পারে না নিষ্ঠুর নির্যাতন এবং রাজাকার বাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। সে গায়েগতরে শক্তিশালী ও একরোখা যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থ অধ্যায়ের ন্যারেটর আবদুল মজিদ। তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। ওরা ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত যেন আর পথ চলতে পারে না। মেথিকান্দা যেতে নৌকায় রামাদিয়া পর্যন্ত গিয়ে পরে আবার দশ মাইল হেঁটে যেতে হবে। আনিস সাবেত জ্বরে প্রায় বেহুঁশ। এই অবস্থায় তারা মোক্তার সাহেবের বাড়িতে স্বল্প সময়ের যাত্রাবিরতি নেয়। মোক্তার সাহেবের বাড়িতে দ্রুতই খানাদানার ব্যবস্থা হয়। এখানে রাজাকার-মিলিটারির ভয়াতঙ্কের কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়।
পঞ্চম অধ্যায়ের কথক আনিস সাবেত। আনিস জ্বরে আক্রান্ত বলে মেথিকান্দা যেতে পারেনি। তার সাথে মোক্তার সাহেবের পরিবারের তরুণীসহ কয়েকজন নারীর মিথস্ক্রিয়া, কথোপকথনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
ষষ্ঠ ও শেষ অধ্যায়ে তারা মেথিকান্দা যায়, কথক নাম পুরুষ বা থার্ড পারসন। যুদ্ধপ্রস্তুতি, দু-একজনের সঙ্গে নতুন করে দেখা এবং বর্ষণমুখর ভয়াবহ রাতের বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু তারা সেখানে যাওয়ার পরই বিকট শব্দ শুনতে পায় :
তা হলে ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আহ কী আনন্দ! ভয় কমে যাচ্ছে সবার। সবাই দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। বিকট শব্দটা হুম হুম করে প্রতিধ্বনি তুলল। থানার হলুদ দালানটি দেখা যাচ্ছে। রং দেখা যাচ্ছে না। কাঠামোটা স্পষ্ট নজরে আসছে। থানার আশেপাশে দু শ গজের মতো জায়গা পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। ঘরবাড়ি নেই, গাছপালা নেই খাঁ খাঁ করছে। অনেক দূর থেকে যাতে শত্রুর আগমন টের পাওয়া যায়, সেই জন্যেই এই অবস্থা। [শ্যামল ছায়া, পৃ. ৪৭]
প্রচলিত ধারার উপন্যাসের নির্মাণ-কাঠামো অনুযায়ী এটি নির্মিত নয়, এখানে অধ্যায়গুলোর কথক উত্তম পুরুষে একেকজন। কিন্তু এই শৈলীকে অভিনব বলার সুযোগ নেই। বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ এবং সতীনাথ ভাদুড়ীরর ‘জাগরী’ উপন্যাস দুটি যে কাঠামোতে রচিত ‘শ্যামল ছায়া’ও সেই একই কাঠামোতে বা ফরমেটে রচিত। ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে জ্যাঠামশায়, শচীশ, দামিনী ও শ্রীবিলাস চরিত্রের শিরোনামে চারটি অধ্যায়ের ভেতরে আরও পরিচ্ছেদ রয়েছে, তবে অধ্যায়গুলোর উত্তম পুরুষে কথক যথাক্রমে জ্যাঠামশায়, শচীশ, দামিনী ও শ্রীবিলাস। সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ উপন্যাসটিতে চারটি অধ্যায় যথাক্রমে ফাঁসি সেল : বিলু, আপার ডিভিশন ওয়ার্ড : বাবা, আওরৎ কিতা : মা এবং জেলগেট : নীলু এবং প্রতিটি অধ্যায়ের আখ্যায়ক যথাক্রমে বিলু, বাবা, মা ও নীলু।
নির্বাসন
‘নির্বাসন’ মূলত জরী নামের একটি মেয়ের বিয়ের উৎসবের গল্প। সাঁইত্রিশ পৃষ্ঠার বিয়ের গল্পটি সাধারণত শহরে একটি পরিবারে যে-ধরনের বিয়ে হয়, বিয়েতে যে-ধরনের আয়োজন হয়; মূলত সেই বিষয়গুলোই এই গল্পের ভিত্তি ও আধেয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসিকা নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসিকা বলা যাবে কি না, এই জিজ্ঞাসা পাঠকের মনে দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এই জিজ্ঞাসার উত্তর হতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের বেদনাদায়ক প্রভাব রয়েছে গল্পের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র আনিসের ওপর। জরীর চাচাতো ভাই আনিস একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত না হলেও যুদ্ধাহত আনিস ছায়ার মতো উপন্যাসের সর্বত্রই বিরাজমান। তার ক্লেশ, মর্মবেদনা এবং জরীর সঙ্গে বিয়ের কথা থাকায় হৃদয়ের হাহাকার নির্বাসন প্রতিফলিত হয়েছে। এই উপন্যাসিকার সংলাপের ধরন ও চরিত্র নির্মাণের কৌশল অনেক তাঁর অনেক লেখাতেই দেখা যায়। কিশোরী অথবা তরুণীদের স্বভাবসিদ্ধ আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে চরিত্র নির্মাণ তিনি সিদ্ধহস্ত। ‘সৌরভ’ ও ‘দেয়াল’ উপন্যাসেও কিশোরী চরিত্রের বর্ণনা জরী কিংবা তার বান্ধবীদেরই ছায়া। তবে জরীর বান্ধবীদের সংলাপের মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে যুদ্ধাহত আনিসের পরিচয় ঘটে এবং আনিসকে জানার কৌত‚হল সৃষ্টি হয়। লেখকের ভাষায়-
আভা হঠাৎ বলল, জরী, তোর ছোট চাচার ছেলে কি আমেরিকা চলে গেছে?
না। সতেরো তারিখ যাবে।
কনক বলল, কী জন্যে যাচ্ছেন? কই আমি তো কিছুই জানি না।
জরী অস্বস্তি বোধ করল। থেমে থেমে বলল, চিকিৎসা করাতে যাচ্ছে। মেরুদন্ডে গুলি লেগেছিল। সেই থেকে প্যারাপ্লেজিয়া হয়েছে। কোমরের নিচ থেকে অবশ।
আমাকে তো কিছু বলিস নি তুই, গুলি লাগল কী করে?
আর্মির লেফটেন্যান্ট ছিলেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যখন পাক আর্মির সাথে যুদ্ধ হয় তখন গুলি লেগেছে। [সত্তর দশকের নির্বাচিত পাঁচটি উপন্যাস, পৃ. ১৮৮]
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আনিস’ যার জীবন বলতে একটি অসাড় দেহ। সে ভালোবাসত চাচাতো বোন জরীকে, জরীও আনিসকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। যুদ্ধের পূর্বে তাদের বিয়ের কথা পাকাপোক্তও ছিল। কিন্তু আহত আনিসের কাছে জরীকে অন্য এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়, যাকে জরী ভালোবাসতে পারেনি। এটি একটি যৌথ পরিবার। আনিসের বাবা গ্রামে চলে গেছে। এখন দুই চাচা থাকেন ময়মনসিংহের কোনো একটি দোতলা বা তেতলা বাড়িতে। এই লেখকের বড় চাচার চরিত্র অন্যান্য চরিত্র যেমন হয়, এই চরিত্রটিও তেমনই।
আনিস বাঁচবে কি না তা নিয়ে পরিবারের সবার মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। তাই তাকে সর্বশেষ চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় পাঠানো হবে। পরী যখন জিজ্ঞেস করল আনিস বাঁচবে কি না। তখন হোসেন সাহেব বলেন,
না। স্পাইনাল কর্ডের লম্বোস্যাকরাল রিজিওন ডেমেজইড। তা ছাড়া শুধু প্যারাপ্লেজিয়া নয়, আরও সব জটিলতা দেখা দিয়েছে। শুনেছি পেথিডিন নিতে হয়। [সত্তর দশকের নির্বাচিত পাঁচটি উপন্যাস, পৃ. ১৯৬]
জরীর বিয়ের আনন্দোৎসবে সারা বাড়ির মানুষ ব্যতিব্যস্ত, আর তখন আনিস ব্যথার জন্য পেথিডিন নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। সে জানে আজকে জরী চলে যাবে। এটি যৌথ পরিবার হলেও জরীর মা আনিসের মাকে অবজ্ঞা করে, চিনতে পারে না এমন একটি নাটকীয় ঘটনাও এতে চিত্রিত হয়েছে।
জরী যখন চলে যায় তখন আনিসের ঘুম ভাঙে। আনিসের পাশে শুয়ে থাকে টিংকু। আখ্যানটি শেষ হয়-
আরও অনেক পরে আকাশে এক ফালি চাঁদ উঠল। তার আলো এসে পড়ল নিদ্রিত শিশুটির মুখে। জ্যোৎস্নালোকিত একটি শিশুর কোমল মুখ, তার চারপাশে কী বিপুল অন্ধকার। গভীর বিষাদে আনিসের চোখে জল এলো। যে জীবন দোয়েলের ফড়িংয়ের মানুষের সাথে তার কোনোকালেই দেখা হয় না। [তদেব, পৃ. ২১৮]
এই আখ্যানে সরাসরি যুদ্ধ স্থান না পেলেও যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব এখানে রয়েছে। লেখক কৌশলে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও অমানবিকতাকে তুলে ধরেছেন। যুদ্ধাহত আনিস চরিত্রটির মধ্য দিয়ে পাঠক অনুভব করতে পারবে মুক্তিযুদ্ধ কতটা জীবনমরণের ধ্বংসাত্মক ছিল। তাদের চিন্তার জানালা খুলবে এবং আবেগের জানালায় ফুটবে বেদনার ফুল। একটি যৌথ মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ের বিয়ের গল্প, এ গল্পের প্রাণভোমরা যুদ্ধাহত, বেদনাকাতর ও বিরহকাতর আনিসকে ক্যানভাসে কয়েকবার দেখা গেলেও আনিস সম্পর্কে জরীর একটিমাত্র যুদ্ধবিষয়ক মন্তব্য ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের আর কোনো বিষয় নেই- বিমূর্ত। শিল্পসাহিত্যের জন্য অ্যাবস্ট্রক্ট ফরমটিই চিরকাল প্রশংসিত হয়ে আসছে।
সৌরভ
উত্তম পুরুষের ন্যারেশনে সত্তর পৃষ্ঠায় ‘সৌরভ’ সময়ব্যাপ্তিতে উপন্যাসের কাহিনি নির্মিত হয়েছে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে বিজয়ের আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। উপন্যাসের ভরকেন্দ্রে রয়েছে ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরের কোনো এলাকার বাড়িওয়ালা।
শারীরিক প্রতিবন্ধী শফিক। উপন্যাসে বর্ণিত সমস্ত ঘটনাই নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের মতো শফিক বর্ণনা করেছে, যেখানে উল্লিখিত সময়ে ঢাকা শহরে সাধারণ মানুষের চালচিত্র এবং মিলিটারিদের আচরণ সম্পর্কে জানা যায়। শফিকের বাসার ভাড়াটে জলিল সাহেব, আজিজ সাহেবের পরিবার, তার দুই কন্যা বিলু ও নীলু, স্ত্রী, নেজাম নামের এক অদ্ভুত প্রকৃতির লোক আর শফিকের কাজের লোক কাদের। শফিকের বোন মগবাজারের কোথাও থাকে, তার স্বামী সরকারি চাকুরে এবং মেয়ে তেরো বছরের শীলা এবং শীলার বান্ধবী অপূর্ব সুন্দরী কিশোরী লুনা মূলত উপন্যাসের প্রাণসঞ্চরণের প্রধান কয়েকটি চরিত্র। এ ছাড়া মহল্লার শান্তি কমিটির সদস্য ইজাবুদ্দিন এম.এ. (গোল্ড মেডালিস্ট) এলএলবি, বন্ধু রফিক, চা-স্টলের মালিক বাচ্চু। কাদের, রফিক ও বাচ্চুর চরিত্রে কিছুটা দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আনুগত্যের আভাস পাওয়া যায়।
শফিক চরিত্রটি টাইপড চরিত্র নয়; ব্যতিক্রম। তার ডান পা বাঁকা হওয়ার কারণে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটে, একসময় কাক পুষত এবং কাকটি ছাব্বিশে মার্চের পর থেকে আর দেখা যায়নি। লাঠিতে ভর করে হাঁটে বলে ঢাকা শহরে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে, মিলিটারি তাকে সন্দেহ করে না। শফিক প্রধান চরিত্র হলেও শারীরিক কারণেই রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
নেজাম সাহেব চালবাজ প্রকৃতির, আবার আধ্যাত্মিকার ভাব ধরে থাকে। উপন্যাসের শুরুতেই পাঠককে আটকে দেওয়ার জন্য কৌশলী লেখক নেজামের সাহেবের ভাষায় প্রকাশ করেন যে, এই বাড়িতে একটি ছোট মেয়ের ছায়া দেখা যায়। কিছুদিন পর আমেরিকা থেকে মতিনউদ্দিন পিএইচডি এসেছে এই বাসায় এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপন্যাসের পাতা দখল করেছে। উপন্যাসের শেষাংশে, তার একটি স্বপ্নের কথা যে স্বপ্নের মাধ্যমে সে লুনাকে চিনতে পারে। স্বপ্নে দেখেছে মেয়েটির নাকের ডগায় তিল আছে। বিষয়টি পাঠককে কত দূর নিয়ে যাবে, তা চিন্তার বিষয়। এখানে কি পাঠকের জন্য লেখক স্বপ্ন-বাস্তবতার কোনো ফাঁদ পেতেছেন? অবশ্যই উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় এই জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যায়।
উনিশ শ একাত্তর সালে ঢাকার যে আগুনঝরা দিন, যুদ্ধবিগ্রহের যে তুমুল আন্দোলন, হত্যাকান্ড, লুটতরাজ, অগ্নিকান্ড ইত্যাদি আগুনের পরশমণি, জোছনা ও জননীর গল্প, রাইফেল রোটি আওরাতসহ সত্তর দশকের আরও কিছু উপন্যাসে যেমন পাওয়া যায়, এই উপন্যাসে তেমন আগুনমুখো আন্দোলনের পরিচয় পাওয়া যায় না; বরং মনে হয় কয়েকটি খুচরো হামলা-আক্রমণ ছাড়া ঢাকার জনজীবন উত্তাপহীন ও স্বাভাবিক।
প্রথম অধ্যায়ে এপ্রিলের ৩ তারিখে এক মাস ধরে জলিল সাহেব বাসায় ফেরেন না। ওই বাসায় প্রতিদিনই কান্নাকাটি করে তার স্ত্রী। একদিন তার ছোট ভাই, স্কুলশিক্ষক আসে ভাইয়ের খোঁজে, শফিকও ইজাবুদ্দিনের সাহায্য চায়। ইজাবুদ্দিন তাকে উদ্ধার করার জন্য আশ্বাস দেয়। জলিল সাহেবের সন্ধানে ছোট ভাই পাঁচ শ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন দেয়। এই বিজ্ঞাপন দেখে জনৈক প্রতারক জলিলের সন্ধান দেওয়ার নামে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেয়।
কাদের সিগারেট আনতে গিয়ে চার ঘণ্টা কোথায় ব্যয় করে আসে, তার কোনো জবাব নেই। সে মাঝে মাঝে এসে আজগুবি খবর দেয়। যেমন- সব্বমোট তেরো লাখ ছয়চল্লিশ হাজার পাঁচ শ পাঞ্জাবি এখন ঢাকা শহরে বর্তমান। আরো আসতাছে। [তাদেব, পৃ. ২২০]
এ রকম আজগুবি খবর আজিজ সাহেবও দেন, যার কোনো ভিত্তি নেই। প্রকৃতপক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা রকম গুজব ছড়িয়ে যেত। টিক্কা খানের মৃত্যুর গুজব এই উপন্যাসেও আছে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এসব গুজবকে আজিজ সাহেব ও কাদেরের সংলাপের মাধ্যমে উপন্যাসে সন্নিবেশিত করেছেন।
শেষের দিকে ঢাকা জনশূন্য হতে থাকে; টু-লেট বাড়তে থাকে। আজিজ সাহেব পরিবার নিয়ে বাড়িতে চলে যায়। সেখানে বিলু ও নীলুর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এদিকে রফিকের ভাইকে একবার ধরে নিয়ে যায়; পরে ছাড়া পেলে কিছুদিন পর তার বিয়ের অনুষ্ঠান হয় ঘটা করে, যে অনুষ্ঠানে ব্রিগেডিয়ার বখতিয়ার উপস্থিত ছিল।
জলিল সাহেব ফিরে আসেন, কিন্তু হানাদারদের নির্যাতনে শরীরের কলকবজা শেষ এবং দুদিন পর মারা যান। ইজাবুদ্দিনকে একদিন (হয়তো) গেরিলারা গুলি করে হাপিস করে দেয়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধরপাকড়ের কয়েকটি ঘটনা, দু-তিনটি কার্ফু, বিহারিদের লুটপাটের একটি ঘটনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আক্রমণের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
দুলাভাইয়ের কথা শেষ হবার আগেই দক্ষিণ দিকে প্রচন্ড একটা আওয়াজ হলো। সমস্ত অঞ্চল অন্ধকার হয়ে পড়ল। দুলাভাই থেমে থেমে বললেন, খুব সম্ভব ট্রান্সমিশন স্টেশনটি শেষ করে দিয়েছে।
শীলা ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করতে লাগল। ঘণ্টা বাজিয়ে কয়েকটা দমকলের গাড়ি ছুটে গেল। গুলির আওয়াজ হলো বেশ কয়েকবার। অত্যন্ত দ্রæত গতিতে কয়েকটি ভারী ট্রাক জাতীয় গাড়ি গেল।
আমরা সবাই শোবার ঘরে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলাম। আমার জানা মতে সেটিই ঢাকা শহরে মুক্তিবাহিনীর প্রথম সফল আক্রমণ। [তদেব, পৃ. ২৫৮]
রফিক আর কাদের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে এক রাতে ঢাকা ত্যাগ করে। তবে গল্পটি জমাট বাঁধে শীলার বান্ধবী লুনাকে কেন্দ্র করে। শীলারা গ্রামে চলে যায় আর লুনাকে দিয়ে যায় শফিকের কাছে। লুনার বাবা-মাকে পাকসেনারা ধরে নিয়ে গেছে। নেপথ্যে কারণ, পাকসেনাদের সঙ্গে লুনার বাবার খুব দহরম-মহরম ছিল। তাদের বাসায় এনে দাওয়াত করে খাওয়াতও। একদিন এক মেজরের নজরে পড়ে লুনা। সে তাকে বিয়ে করতে চাইল। লুনাকে শীলাদের বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে লুনার বাবা বলল যে, লুনা চট্টগ্রামে নানার বাড়িতে গেছে। সেখান থেকে এলে বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে। শীলার বাবার কথা অনুযায়ী শফিকের বাসা থেকে লুনাকে তার চাচার নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু চাচার আর কোনো হদিস পাওয়া গেল না। লুনাকে নিয়ে বিপদে পড়ে শফিক; আর এই বিপদের মধ্য দিয়েই উপন্যাস শেষ হয়-
আমি বসেই রইলাম। বসেই রইলাম। লুনা ফিসফিস করে তার মাকে একবার ডাকল। হঠাৎ লক্ষ করলাম, মতিন সাহেব ঠিকই বলেছেন। মেয়েটির নাকের ডগায় ছোট একটি লাল রঙের তিল। বহু দূরে একসঙ্গে অনেকগুলো কুকুর ডাকতে লাগল। আমার ঘরের প্রাচীন তক্ষকটি বুক সেলফের কাছে থেকে মাথা ঘুরিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। [তদেব, পৃ. ২৮৭]
এই উপন্যাসে শফিক কাক পোষে। গ্যাব্রিয়েলা মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ উপন্যাসের নায়িকা ফারমিনা ডাজা ছয়টি কাক পুষত। শুধু কি কাক, সাপও পুষত। বুদ্ধদেব গুহের ‘মাধুকরী’ উপন্যাসের গিরিশদার চরিত্রটি বড় বিচিত্র। তিনিও কাকসহ বিভিন্ন প্রাণী পোষেন। এ ধরনের অপ্রচলিত বিষয় কোনো ফিকশনকে সমৃদ্ধ করে কিনা জানা নেই, তবে নিঃসন্দেহ যে, পাঠক কৌত‚হলী হয়, আমুদ পায়। ফিকশনে টাইপ ক্যারেক্টার ফিকশনকে দুর্বল করে। এ ধরনের কৌত‚হলোদ্দীপক ভিন্ন ধরনের ক্যারেক্টার পাঠককে উপন্যাসের গল্পে আটকে রাখার জন্য বেশ উপাদেয়।
যুদ্ধের সময় মতিন সাহেব আমেরিকা থেকে ঢাকা এসেছেন। এই চরিত্রটি যদি এই উপন্যাসে না থাকত তাহলে হয়তো কাহিনির তেমন কোনো ক্ষতি হতো না। তবে চরিত্রটি যুক্ত হওয়াতে হিউমারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আবার তিনি স্বপ্ন দেখেছেন লুনার নাকে লাল রঙের তিল। স্বপ্ন-বাস্তবতার ধারণাটি সৃষ্টির কৌশল হিসেবে যুদ্ধের সময় মতিন সাহেবকে যুদ্ধের সময় ঢাকায় আনা হয়েছে কি না এ বিষয়েও সংশয় থেকে যায়। তিলের স্বপ্নটি তো শফিকও দেখতে পারত…।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ছোট ছোট বাক্যে সরল ও সাবলীল ভাষায় রচিত হয়। তাঁর উপন্যাসে ও গল্পের প্রধান আকর্ষণ হিউমার। হিউমারের জন্য তাঁর সমকক্ষ লেখক পাওয়া দুষ্কর। আলোচিত তিনটি উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধের সিরিয়াস উপন্যাস হলেও হিউমারও অনুপস্থিত নয়। সৌরভ ও নির্বাসন প্রথম পুরুষে লেখা। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের নাম সংকট প্রায়ই লক্ষ করা যায়। শফিক হয়তো তাঁর খুব প্রিয় একটি নাম। ‘নন্দিত নরকে’ মাস্টার কাকার নাম শফিক এবং ‘দেয়াল’ শেষ উপন্যাসেও নায়কের নাম ‘শফিক’।
‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামে চারটি চরিত্র, যেমন- রাবেয়া খোকা, রাবেয়া, মন্টু, রুনু রয়েছে। একই নামের চরিত্র একাধিক উপন্যাসে চিত্রিত করার যুক্তি বা সুফল আছে কি না আমাদের জানা নেই। সবশেষে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদের তিনটি উপন্যাসিকার নামকরণের মধ্যে ‘নির্বাসন’ নামটি আখ্যানের তাৎপর্যপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। ‘সৌরভ’ নামটি বিমূর্ত এবং আখ্যানের সঙ্গে এর ভাবগত তাৎপর্য উন্মোচন কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে ‘শ্যামল ছায়া’ নামটি যেন বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে যেখানে ব্রিজটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর শীতল ছায়ার প্রশান্তি যোদ্ধাদের মনে বয়ে যায়।