বন্দি দিন বন্দি রাত্রি: ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

মোজাম্মেল হক নিয়োগী

অর্ধশতাধিক গ্রন্থের লেখক ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ একজন সংগ্রামী নারী। বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া নারীদের সামনে একটি দীপ্তিমান আলোকবর্তিকার নাম। বাংলাদেশে একটি পিছিয়ে পড়া জেলা, ভাটির দেশ বলে পরিচিত; যেখানে বর্ষায় নৌকা আর শীত-গ্রীষ্মে হেঁটে চলা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই, সেই জেলার ধরমপাশা গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ২৭ জুলাই; যখন দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের কারণে সময়টা তখন সারা পৃথিবীতেই ভয়াবহ, উন্মাতাল, আগুনমুখী এবং বাতাসে পোড়া বারুদের গন্ধ। বর্ষাকালে ধরমপাশা উপজেলার সুখাইড় গ্রামটিকে দূর থেকে হাওরে ভাসমান একটি দ্বীপ হিসেবেই কল্পনা করা যায়। বাবা সুধাংশু শেখর রায় এবং মা নীলিমা চৌধুরীর প্রথম সন্তান তিনি। ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ রবীন্দ্রনাথ কবিত্বের প্রতিভা শিশু বয়সেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থও দশ বছর বয়সে তাঁর লেখক প্রতিভা প্রকাশ করেছিলেন ১৯৫৫ সালে দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতায় ‘বাদল দিনে’ গল্প প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে বি.এ ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পর ব্যাংকার শৈলেন্দ্র শেখর দাশ পুরকায়স্থর সঙ্গে বিয়ে হয়। তাঁদের ছিল চার সন্তান। ১৯৬৮ সালে স্বামীর চাকরির সুবাদে তিনি করাচি চলে যান এবং সেখানে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় আটকা পড়েন। তারপর নানা বাধা পেরিয়ে কোয়েটা, কান্দাহার ও আফগানিস্তান হয়ে দেশে আসেন। সন্তানদের বড় করার দায়িত্বে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে তিনি ১৯৭৬ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এমএ পাস করে পুষিয়ে নেন। তিনি দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করেন। বলা বাহুল্য, সে বছর কেউ প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হননি।
তাঁর পরিবারের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির আবহে তিনি লেখকসত্তাকে জাগিয়ে তোলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তিনি একটি শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যে পরিবারের সবাই পড়াশোনা ও সংস্কৃতিচর্চা করতেন। মা-বাবা, ফুফু-চাচারাও গান, তবলা, সেতার বাজানোসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন; যে আবহে তিনি নিজের ভিত্তি তৈরি করেছেন। তবে ওই পরিবার থেকে তিনিই কেবল লেখালেখির জগতে এলেন এবং সুখ্যাতি অর্জন করেন আপন কীর্তিতে। বাড়িতে বিশাল লাইব্রেরি ছিল। ছোটবেলায় সেসব বই পড়ে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টিভির তালিকাভুক্ত গীতিকার, কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হলেও শিশুসাহিত্যে তাঁর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি। বইয়ের সংখ্যা শিশুসাহিত্যের ৩৬টি, উপন্যাস ১০টি এবং ছোটগল্পগ্রন্থ ১৫টি। তাঁর লেখায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা সবচেয়ে বেশি স্থান দখল করেছে।

‘বন্দি দিন বন্দি রাত্রি’
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘বন্দি দিন বন্দি রাত্রি’ উপন্যাসটিতে লেখকের দরদের উত্তাপ পাওয়া যায়। এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট করাচির ‘মুসা বস্তি’ এলাকা, যেখানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হতদরিদ্র মানুষ জীবিকার সন্ধানে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা, দিনমজুর এবং মেয়েরা বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা যেমন ঢাকার বস্তিবাসী হয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের নাগরিক জীবনকে সহজ করে এবং তাদের শরীরে রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে এই শ্রেণির মানুষদের সুখ-স্বচ্ছন্দ এনে দেয়, ঠিক একই চিত্র করাচির ‘মুসা বস্তি’র মানুষের মধ্যে লেখক অত্যন্ত দরদ দিয়ে চিত্রিত করেছেন। এই উপন্যাসের থিম ও মোটিফ মুক্তিযুদ্ধ নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব নেই। তবে স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের বুকের গহনের আর্তনাদ ও হাহাকার প্রচ্ছন্নভাবে অনুভব করা যায়। দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসার ফলে প্রকাশ পায় ভাষা আন্দোলনসহ তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা, গণ-আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানিদের নির্যাতন, করাচিতে বসবাসরত বস্তিবাসীদের হাহাকার, সেখানকার বাঙালিদের বাংলাদেশের স্বাধীনতায় উচ্ছ্বাস, তখনকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকায় একাত্তর সালের দু-একটি প্রকাশিত খবর, বঙ্গবন্ধু, ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর বক্তৃতাংশ ইত্যাদি বিষয় মুক্তিযুদ্ধেরই অংশ। এতে হতদরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্টের ন্যারেশনের পাশাপাশি বিপথগামী পরিস্থিতির শিকার হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামের অংশই কতিপয় মানুষের দেহ ব্যবসা উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। পক্ষান্তরে ভোগবিলাসী ঠগ ও প্রবঞ্চক উচ্চবিত্তের দেহ বিলিয়ে ঐশ্বর্যের মোহে আচ্ছন্ন থাকার ঘটনা বিধৃত হয়েছে। তবে উভয় পর্বেই পাকিস্তানে থাকা কিছু মানুষের বাংলাদেশে ফিরে আসার আহাজারিও প্রকাশ পেয়েছে। এ-রকম হওয়াটা খুব স্বাভাবিক এ জন্য যে, দেশ স্বাধীন হলেও তারা পাকিস্তানে আটকা পড়লে কী ঘটবে না ঘটবে, সেই বোধশক্তি বস্তিবাসীদের মধ্যে খুব বেশি প্রখর থাকার কথা নয়। দ্বিতীয় পর্বে ফিরোজের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসার কিছুটা ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে।
দুটি পর্বে উপন্যাসটি বিভক্ত। উপন্যাসে কোনো অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ নেই। বলা যাবে না যে খুব জমাটবাঁধা গল্প এতে রয়েছে। শিকড়ছেঁড়া মানুষের কথা এবং তাদের জীবনাচারের গল্পও ছেঁড়া ছেঁড়া।
শুরুতেই লেখক করাচির ‘মুসা বস্তি’তে বসবাসরত বাঙালিদের দারিদ্র্যপীড়িত কয়েকটি পরিবারের অপরিচ্ছন্ন ও ঘিঞ্জি আবাসস্থল এবং শাকান্ন জোটানোর জীবনসংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠে উপন্যাসের ক্যানভাসে। ন্যারেশনের চেয়ে সংলাপের আধিপত্য বেশি। পুরুষ চরিত্রের চেয়ে নারী-চরিত্রের আধিক্য থাকলেও পুরুষদের কুটচাল, দোর্দন্ড প্রতাপ যা সাধারণত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দৃষ্ট হয়, তা এখানেও অঙ্কিত হয়েছে। কলিমন, চম্পা, জমিলা, ময়না, লাবুর মা, মরিয়ম, আলমের মা, ফুলবানু, সাহারাবানু প্রভৃতি নারী চরিত্র এবং গফুর, রহমত, মালেক…প্রভৃতি পুরুষ চরিত্র উপন্যাসের প্রথম পর্বের প্রাণ।
দুর্দশাগ্রস্ত বস্তিবাসীদের সংলাপগুলো লেখা হয়েছে ঢাকা কিংবা এর আশপাশের কোনো অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায়। চরিত্রগুলোর সংলাপ, পান-জর্দা খাওয়া, কদু-সিমের তরকারির আলাপচারিতা, মহল্লার অশ্লীল গালগল্প বিষয়গুলো বাঙালি পাঠকের মনে হবে যে, এই চিত্র দেশের মানুষেরই। লেখক করাচির ধনাঢ্য গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনামূলক বর্ণনাও করেছেন-
হগস্ বে, ক্লিফটনের জোয়ারের উচ্ছ্বাস, নীয়ন আলোর শত শত নীরব বিজ্ঞাপন, সাগরের বুক ছুঁয়ে আসা হিমেল হাওয়া, রিকসা, মোটর গাড়ির দিনরাত্রির মিছিল সোসাইটি আর বাথ আইল্যান্ডের স্কাই স্ক্রেপার বাড়িগুলো নিয়ে যেখানে করাচি নগরীর পরিচয়, কেই বা জানতে চায় এই করাচির বুকের ওপর চট করে চাঁচ দিয়ে কুকুরের মতো আস্তানা গেড়েছে কতো দেশছাড়া, বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়ে সব খুইয়ে আসা অসহায় ভেতো বাঙালির একমুঠো ভাতের আশায়। লাউ আর সিম গাছের মাচান, পুঁই-এর নধর ডাঁটার জাংলাঘেরা মাটির নিকানো আঙিনায়, নাকে নথ পরা কতো কিশোরীর ভীরু স্বপ্ন, কতো বাজুবন্দ পরা স্বামী সোহাগিনীর মতো কামনা আজ এই নগরীর বুকে মিথ্যে স্বপ্ন হয়ে মাথা কুটে মরছে। [বন্দি দিন বন্দি রাত্রি, পৃ. ১২১]
উপন্যাসের প্রথম পর্বে অনেকগুলো চরিত্রকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে লেখক নির্মোহ ও বিশ^স্ততার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। বস্তিবাসী এই চরিত্রগুলোর মধ্যে বিষাদের সুর বাজতে থাকে। গফুর তাগড়া জোয়ান, বয়স অল্প, সিলেটে বাড়ি, বাবার সঙ্গে রাগ করে করাচি গিয়েছিল, সবজি ফেরি করে বিক্রি করে। কিন্তু তার আর ফেরার সুযোগ নেই। কলিমনকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু কলিমন পাত্তা দেয় না; কারণ, তাকে নিয়ে কলোনিতে কানাঘুষা হয়। স্মৃতি হানা দেয়। রহমতের স্ত্রী চম্পা, কিন্তু মালেক তার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে। রহমত স্ত্রীকে নির্যাতন করে। দেরিতে কাজে গেলে বেতন কাটা হয়। এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কেউ ভালো রোজগারের প্রত্যাশায় অথবা অন্য কোনো কারণে করাচিতে ওই বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন তো দেশ ছিল একটাই, তাই তাদের যেতে সমস্যা কী? একাত্তরের যুদ্ধের পর তাদের আর দেশে ফেরা হলো না। দেশের জন্য তাদের অন্তরাত্মা হাহাকার করে কিন্তু দেশে ফিরতে পারে না। তখন পাকিস্তানে অবস্থাসম্পন্ন প্রায় সব বাঙালি ফিরতে পারলেও হতদরিদ্ররা ফিরতে পারেনি। আবার কিছু অবস্থাসম্পন্ন পাকিস্তানে রয়ে গেছে বলেও জানা যায়।
মুসা বস্তিতে প্রেম ও বিচ্ছেদেরও নানা ধরন আছে। ময়নার বাপ অর্থাৎ কলিমনের স্বামী বাংলাদেশে এসে আটকা পড়ে গেছে; তার তো সেখানে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রেশমির চরিত্রটি পাঠককে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। পুরো উপন্যাসটিতে বস্তিবাসীর মতো ঝগড়াঝাঁটি যেমন আছে, ঠিক তেমনি মায়া-মমতা আছে এবং একইভাবে নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং দারিদ্র্যের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করার মতো ঘটনাও এই উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। আরও বর্ণিত হয়েছে প্রেম, বিচ্ছেদ ও পরকীয়া এবং রোগ-ব্যাধির নিষ্ঠুর আগ্রাসন।
দ্বিতীয় পর্বটি নির্মিত হয়েছে কোনো এক কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার শফিক, তার স্ত্রী কবিতা, তার কন্যা এবং পার্শচরিত্র হিসেবে ফিরোজ। তরুণ বয়সে ফিরোজের প্রেমিকা ছিল কবিতা, কিন্তু অর্থ, খ্যাতি, ভোগ বিলাসিতার লোভে কবিতা প্রেমের মর্যাদা না দিয়ে শফিককে বিয়ে করেছিল। শফিক এমন একটি চরিত্র যে কিনা স্ত্রী কবিতাকে বেলেল্লাপন্না করতে বাধা দেয়নি, আর্মি অফিসারদের সঙ্গে মেলামেশা করে স্বামীর প্রমোশনের ব্যবস্থা করেছে এমন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। শফিকের বহুগামিতার রূপও উপন্যাসে উন্মোচিত।
আদর্শ চরিত্র হিসেবে ফিরোজকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন লেখক। ফিরোজকে অর্থের লোভে তার আদর্শকে বিচ্যুতি ঘটাতে পারেনি কিন্তু কবিতার প্রতি তার দুর্বলতা থাকলেও ফিরোজের সঙ্গে কবিতার কোনো নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ফিরোজের আত্মকথনের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, একুশে ফেব্রæয়ারির স্মৃতিচারণ, সত্তরের নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর কথা স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সংবাদের মাধ্যমে লেখক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি তুলে এনেছেন। পঁচিশে মার্চের কালরাত্রির গণহত্যার বিষয়টি এসেছে শফিকের ভাবনায়:
[…] পঁচিশে মার্চের ভয়াল কালো রাত্রি। দুঃখ আর অশ্রæর কাফনে ঢেকে দিয়েছে সারা বাংলা। ঘরে ঘরে আর্তনাদ। বোবা কান্নায় সবার চোখ বাষ্পাভ, গৈরিক মাটি রক্তে লাল হয়ে উঠলো।
ফিরোজ করাচির ঐ সুনীল আকাশেও দেখতে পেল সেই বোবা কান্নার ছোঁয়া, সুরভিত হাওয়ায় শুনতে পেল কতো বধুর বুক ফাটানো আর্তনাদ। [তদেব, পৃ. ১৯২]
একাত্তরে বাঙালিরা পাকিস্তানে সাধারণভাবে চলাফেরা করতে পারত না। বাসে, ট্যাক্সিতে বাঙালিদের চলাফেরা দুষ্কর হয়ে পড়ল। যুদ্ধ নিয়ে বাঙালিদের ভাবনার শেষ ছিল না। তারা জানত প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটছে। কিন্তু তাদের মন কাঁদত। লেখকের বর্ণনা:
মুসা কলোনিতে শুরু করে প্রতিটি মহল্লায় বাঙালি ঘরে ঘরে কাঁদছে বঙ্গবন্ধুর জন্য।
বঙ্গবন্ধু, তুমি তো বাঙালিকে শুধু ডালা ভরে দিয়েছ, প্রতিদানে তুমি কি পেয়েছ?
জানি না রুদ্ধ কারাবাসে একক নিঃসঙ্গ নির্জনতায় আমাদের শুভাশিষ তোমার কাছে পৌঁছেছে কিনা। আকাশবাণী প্রচার করল মুজিবÑ মুজিবের অর্থ হলো মমতা, মুজিবের অর্থই বাংলাদেশ। একটি মাত্র নামের মহিমা শত শত অর্থের মাঝে মিশে লীন হয়ে গেল। [তদেব, পৃ. ১৯৪]
এই উপন্যাসের একটি শক্তিশালী দিক হলো যে, একাত্তরের যুদ্ধকালীন পাকিস্তানের অবস্থা কেমন ছিল, তা পাঠকের কিছুটা হলেও জানা সম্ভব হচ্ছে। এমন একটি বিষয় যে, পাকিস্তানের বেতারে মায়াবী সুরে যে গান গাইত, সে সব গানে পাকসেনাদের শহিদ বলা হতো। তারা শহিদ হয়ে আকাশের তারা হয়ে জ¦লবে। লেখক এমন একটি গানের দুটি কলি উল্লেখ করেছেন:
পশ্চিমের বেতার থেকে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গানগুলো সুরের মাধুরীতে সমৃদ্ধ হয়ে ইথারে ভাসলো।
-এ ওয়াতান কী শহীদো-
তোমহারা নাম সিঁতারোকে তরা চমকে গা।[তদেব, পৃ. ১৯৫]
দ্বিতীয় পর্বে উপন্যাসের দুটি প্রবাহে বহমান। একটি প্রবাহে বাঙালি চরিত্রগুলোর বাংলাদেশের পরিস্থিতি ধারণ করেছে এবং দ্বিতীয় প্রবাহে ধারণ করেছে শফিক ও ফিরোজের মানসিক দ্ব›দ্ব। শফিকের উচ্চাভিলাষী জীবনযাপন এবং কবিতার নৃত্য, সংগীতচর্চা, ক্লাবে যাতায়াত, শফিকের বহুগামিতা; এবং ফিরোজের মধ্যবিত্তের জীবনযাপন এবং দেশপ্রেম। বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সে দেশের সামাজিক অবস্থা গণমানুষের মনস্তাত্তিক অবস্থার প্রক্ষেপণ পড়েছে উপন্যাসের পাতায়। উপন্যাসটি শেষ হয়-
তবু ফিরোজের বুকের গহীনে সহস্র ধারায় আলোর রোশনাই ছড়িয়ে যেতে থাকে। নতুন স্বাধীনতা পাওয়া বাংলায় ফুলের মতো ফুটে ওঠা উন্মুখ কলিগুলোর জন্য ফিরোজ প্রার্থনা করে। পাকিস্তানি সৈন্যদের ধর্ষণে যারা অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের বোঝা বহন করেছে, ওদের অন্ধকার জীবনে বিধাতা তুমি সূর্য হয়ে দেখা দাও। অনাদৃতা হাজারো নারীকে এই পৃথিবীতে সম্মানজনক স্থান দাও প্রভু।
[…] ‘অসতো মা সদ্গময় তমসো মা জ্যোতির্গময়।’
এড়ফ ংধরফ, দখবঃ ঃযবৎব নব ষরমযঃ ধহফ ঃযবৎব ধিং খরমযঃ (ঙষফ ঞবংঃধসবহঃ) [তদেব, পৃ. ২০৭]
এই উপন্যাসে কিছুটা সংলাপের প্রাধান্য থাকায় কাহিনি নির্মাণে শিথিলতা পরিলক্ষিত হয়। সংলাপ কমিয়ে ন্যারেশনের দিকে বেশি মনোযোগ দিলে কাহিনির দানা বাঁধার সুযোগ ছিল। তবে অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোর মধ্যে আমাদের জানা মতে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস, যেখানে পাকিস্তানে বসবাসরত বাঙালিদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানার সুযোগ হলো। একই সঙ্গে পাঠকের মনে বিষাদের ছায়া পড়তে পারে এই ভেবে যে, বিনা দোষে কাজের সন্ধানে যাওয়া অনেক বাঙালি পাকিস্তানে এখনও পড়ে আছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না জানা নেই, না হলে উদ্যোগ নিলে মানুষগুলোর অন্তরাত্মার দহন নিবৃত হতো।

[বি.দ্র. বিশ্বসাহিত্য ভবন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘বন্দি দিন বন্দি রাত্রি’ শিরোনামের মলাটে তিনটি উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ২০৮। ‘বন্দি দিন বন্দি রাত্রি’ উপন্যাসটির প্রকৃত পৃষ্ঠাসংখ্যা ৯০। এ-কারণে রেফারেন্সে পৃষ্ঠাসংখ্যা বেশি হয়েছে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *